নীরবতা পেরিয়ে নতুন সুরে আরফিন রুমি, ফিরেই ব্যস্ত গানের জগতে

নীরবতা পেরিয়ে নতুন সুরে আরফিন রুমি, ফিরেই ব্যস্ত গানের জগতে
আরফিন রুমি / ছবি: সংগৃহীত

বিনোদন ডেস্ক:– প্রকাশ: ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬

চলো শুরুটা সেখান থেকেই—যখন মঞ্চের আলো নিভে আসে, দর্শকঘরে নিস্তব্ধতা, আর সেই মুহূর্তেই আরফিন রুমির কণ্ঠে বাজে এক নতুন প্রত্যাবর্তনের সুর। এক সময় বাংলাদেশি সংগীতের প্রতিটি বাঁকে, প্রতিটি প্রেম কিংবা দেশাত্মবোধক মুহূর্তে রুমির গান ছিল সঙ্গী। অথচ, হঠাৎ করেই তিনি হারিয়ে গেলেন, যেন সব আলো নিভে গেল। সেই আরফিন রুমি এখন আবার ফিরে এসেছেন, একেবারে নতুন উদ্যমে, অভিজ্ঞতায় আরও পরিণত হয়ে।

এক সময় ছিল, যখন মাসের প্রতিটি দিনেই তাঁর নতুন গান মুক্তি পেত। রেকর্ডিং, স্টেজ শো, ভিডিও—সব মিলিয়ে তাঁর ব্যস্ততার কোনো তুলনা ছিল না। এমনও হয়েছে, টানা ২৮ দিনে ২৮টি গান প্রকাশ করেছেন তিনি। এই সাফল্যে যখন রুমি ছিলেন চূড়ায়, তখনই আচমকা থেমে যায় সবকিছু। গুঞ্জন, গুজব, হতাশা—সবকিছুর মধ্যেই রুমি চলে গেলেন আড়ালে। কেউ জানত না, কবে ফিরবেন, আদৌ ফিরবেন কিনা।

কিন্তু রুমি নিজে এই বিরতিকে দেখেন নতুন চোখে। তাঁর ভাষায়, “শিল্পীকে সব সময় সামনে থাকতে হবে—এমন কোনো নিয়ম নেই। কাজের মাঝে মাঝে ডুব দিতে হয়, তবেই ফিরে আসা যায় নতুন উদ্যমে।” ব্যক্তিগত জীবনের টানাপোড়েন, আইনি জটিলতা, কিছু সম্পর্কের ভাঙন তাঁকে ভেঙে দিলেও, তিনি আবারও নিজেকে গড়ে তুলেছেন অন্যরকম এক শিল্পী হিসেবে ।

নীরবতা পেরিয়ে নতুন সুরে আরফিন রুমি, ফিরেই ব্যস্ত গানের জগতে
আরফিন রুমি / ছবি: সংগৃহীত

এই নীরবতার সময়ই তাঁকে বদলে দিয়েছে। আগে সবকিছুকে নিজের মতো না পেলে খারাপ লাগত, এখন অনেক সহজে মেনে নিতে পারেন। সংগীতের প্রতি তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি বদলেছে, অভিজ্ঞতা বেড়েছে। এখন তিনি সংগীতকে দেখেন আরও গভীরভাবে, আরও সংবেদনশীলভাবে।

ফিরে আসার গল্পটা শুরু হয় যখন মোস্তফা কামাল রাজের নাটক “এটা আমাদের গল্প”-এর টাইটেল গান গেয়ে আবার আলোচনায় আসেন রুমি। গানের জনপ্রিয়তা ছড়িয়ে পড়ে, দর্শক-শ্রোতারা যেমন প্রশংসা করেন, তেমনি সহশিল্পীরাও গানটিকে নিজেদের পরিবারের প্রিয় তালিকায় রেখেছেন। এই ভালোবাসা রুমিকে আবারও নতুন করে কাজের অনুপ্রেরণা দিয়েছে ।

এবারের যাত্রাটা আগের মতোই ব্যস্ততায় ভরা—ডজনখানেক নতুন গান, প্রায় ৩০টি গানের ভিডিও প্রজেক্ট, স্টেজ শো, নাটকের আবহ সংগীত। রুমি বলেন, “আমি তো আগে নিয়মিতই মাসে পাঁচ-ছয়টা গান করতাম। ২০১৯ সালে ২৮ দিনে ২৮টা গান দিয়েছিলাম ইউটিউবে। শিল্পী হিসেবে এটাই আমার কাজ।” এই অভ্যাসটা তাঁর কাছে নতুন কিছু নয়, বরং নিজেকে বারবার প্রমাণের এক আত্মবিশ্বাসী প্রয়াস ।

নতুন প্রজন্মের সঙ্গে মঞ্চে গান গাওয়ার অভিজ্ঞতা তাঁকে আবারও তরুণ করে তুলেছে। সাম্প্রতিক স্টেজ শোগুলোয় তরুণ-তরুণীদের উচ্ছ্বাসে ভেসেছেন রুমি। “শ্রোতার পালস তো আমার বোঝা। সবাই গান জানে, গেয়ে ওঠে। এটাই আমাকে সবচেয়ে বেশি অনুপ্রাণিত করে, শ্রোতাদের প্রতি দায়বদ্ধ করে তোলে,” বলেন তিনি।

নীরবতা পেরিয়ে নতুন সুরে আরফিন রুমি, ফিরেই ব্যস্ত গানের জগতে
আরফিন রুমি / ছবি: সংগৃহীত

রুমির সংগীত যাত্রার শুরুটা কিন্তু ক্রিকেট দিয়ে। ছোটবেলায় ক্রিকেট খেলতেন, কিন্তু মায়ের উৎসাহে হারমোনিয়াম হাতে তুলে নেন। বিজ্ঞাপনচিত্রের জিঙ্গেলে কণ্ঠ দিয়ে সংগীতে পথচলা শুরু। ২০০৭ সালে নিজের প্রথম অ্যালবাম, এরপর একের পর এক অডিও, চলচ্চিত্রের গান, সুর ও সংগীত পরিচালনা—সব মিলিয়ে হয়ে ওঠেন সংগীতের ব্যস্ততম এক নাম ।

ক্যারিয়ারের শুরুতে হাবিব ওয়াহিদের সঙ্গে পরিচয়, তাঁর কাছ থেকে কাজ শেখা এবং ফুয়াদ আল মুক্তাদিরের সংস্পর্শ রুমির সংগীতচর্চায় বড় অবদান রাখে। পরে তিনি নিজেই গায়ক, সুরকার ও সংগীত পরিচালক হিসেবে আলাদা অবস্থান গড়ে তোলেন। ‘বলোনা কোথায় তুমি’, ‘সহেনা যাতনা’, ‘জ্বলে ওঠো বাংলাদেশ’, ‘প্রিয়তমা’, ‘হৃদয়ে আমার বাংলাদেশ’, ‘চিঠি’, ‘তোমারই পরশে’, ‘খুঁজে খুঁজে’, ‘তুই আর আমি’, ‘তুমি আমার’—এসব গান তারকা খ্যাতি এনে দেয় তাঁকে ।

শুধু তাই নয়, তাঁর ফিচারিং করা ‘এক জীবন’, ‘সোনা বউ’, ‘এর বেশি ভালোবাসা যায় না’—এসব গানও শ্রোতাদের মুখে মুখে ফিরেছে। প্রেম, দেশাত্মবোধক, রিদমিক—সব ধরনের গানে নিজের দক্ষতা দেখিয়েছেন রুমি।

নীরবতা পেরিয়ে নতুন সুরে আরফিন রুমি, ফিরেই ব্যস্ত গানের জগতে
আরফিন রুমি / ছবি: সংগৃহীত

ব্যক্তিগত জীবনের টানাপোড়েন, ডিভোর্স, আইনি জটিলতা—এসব কিছুর মধ্য দিয়েও সংগীতের প্রতি ভালোবাসা হারাননি। বরং তিনি বিশ্বাস করেন, এই অভিজ্ঞতাগুলো তাঁকে আরও পরিণত করেছে—জীবন ও সংগীতকে দেখতে শিখিয়েছেন নতুন চোখে ।

এই প্রত্যাবর্তন শুধুই পুরোনো গৌরবের পুনরাবিষ্কার নয়, বরং নতুন ধারার সৃষ্টি। সংগীত পরিচালনা, নতুন গান, আবহ সংগীত—রুমির কাজের বিস্তার এখন আরও বড়। তাঁর এই ‘ফিরে আসার গল্প’ শুধু তাঁর নিজের নয়, বরং বাংলার সংগীতাঙ্গনের জন্যও এক নতুন দিগন্তের গল্প।

রুমির প্রত্যাবর্তন প্রমাণ করে, সত্যিকারের প্রতিভা কখনও হারায় না। শ্রোতারা তাঁকে নতুন করে বরণ করেছে, আবারও তাঁর গানে খুঁজে পেয়েছে পুরোনো সেই আবেগ, নতুন সেই স্পর্শ।

শেষ কথা—আরফিন রুমির গল্প কেবল একজন সংগীতশিল্পীর ফেরার গল্প নয়, বরং প্রতিটি হারিয়ে যাওয়া স্বপ্ন আর সম্ভাবনারও গল্প। বিরতি, হতাশা, ব্যক্তিগত ঝড়—সব পেরিয়ে আবারও যিনি ফিরে আসেন, তিনিই তো আসলে জীবনের আসল শিল্পী। আরফিন রুমির ফিরে আসার গল্প তাই শুধু গানের নয়, সাহসেরও গল্প।


Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top