হায়ার বাংলাদেশে এর বিরুদ্ধে রেয়াতি সুবিধা নিয়ে তৈরি এসি-ফ্রিজ আমদানির অভিযোগ

রেয়াতি শুল্ক-কর সুবিধা নেওয়ার পাশাপাশি তৈরি এসি, ফ্রিজ ও ওয়াশিং মেশিন আমদানির অভিযোগ উঠেছে হায়ার বাংলাদেশের বিরুদ্ধে। তদন্তের দাবি শিল্পসংশ্লিষ্টদের।

হায়ার বাংলাদেশে এর বিরুদ্ধে রেয়াতি সুবিধা নিয়ে তৈরি এসি-ফ্রিজ আমদানির অভিযোগ
হায়ার বাংলাদেশে ছবি : সংগৃহীত

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা

স্থানীয় উৎপাদন উৎসাহিত করতে দেওয়া শুল্ক-কর সুবিধা নিয়ে সম্পূর্ণ তৈরি এসি, ফ্রিজ ও ওয়াশিং মেশিন আমদানির অভিযোগ উঠেছে চীনা প্রতিষ্ঠান হায়ার বাংলাদেশ লিমিটেডের বিরুদ্ধে। শিল্পসংশ্লিষ্টদের দাবি, প্রতিষ্ঠানটি স্থানীয় উৎপাদনকারী হিসেবে রেয়াতি সুবিধা নেওয়ার পাশাপাশি তৈরি পণ্য আমদানি করে থাকলে তা সরকারের শিল্পনীতির উদ্দেশ্য ও স্থানীয় উৎপাদকদের জন্য প্রতিযোগিতার পরিবেশ—দুই ক্ষেত্রেই প্রশ্ন তৈরি করে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রের দেওয়া আমদানি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সাল থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত হায়ার বাংলাদেশ চীন থেকে ৩ লাখ বিটিইউ ক্ষমতার ৯৮টি রেডিমেড সেন্ট্রাল এয়ার কন্ডিশনিং সিস্টেম আমদানি করেছে। এসব পণ্য মূলত ভিআরএফ (ভেরিয়েবল রেফ্রিজারেন্ট ফ্লো) এসি বলে সূত্রটি জানিয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, এগুলো ক্যাপিটাল মেশিনারিজ হিসেবে ঘোষণা দিয়ে খালাস করা হয়েছে।

সরকার শিল্পায়ন ও বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে ক্যাপিটাল মেশিনারি ও যন্ত্রাংশ আমদানিতে বিশেষ শুল্ক সুবিধা দিয়ে থাকে। ফলে আমদানি করা পণ্যগুলো প্রকৃতপক্ষে উৎপাদন প্রক্রিয়ায় ব্যবহারের মূলধনি যন্ত্র, নাকি সরাসরি বিক্রিযোগ্য তৈরি পণ্য—তা কাস্টমস নথি ও পণ্যের প্রকৃতি যাচাই করে নির্ধারণের দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

এসি আমদানির পাশাপাশি হায়ার বাংলাদেশ ৩৬৯ লিটার ধারণক্ষমতার ১৪৮টি রেডিমেড চেস্ট ফ্রিজার এবং ৪৪৮টি করে এসি কম্প্রেসার ও মোটর আমদানি করেছে বলেও সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

ওয়াশিং মেশিন আমদানির ক্ষেত্রেও বড় পরিমাণের তথ্য পাওয়া গেছে। সূত্রের দাবি, ২০২৩ সাল থেকে ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত ৭ থেকে ১৪ কেজি ধারণক্ষমতার বিভিন্ন মডেলের ৪৫ হাজার ৬৪টি হায়ার ব্র্যান্ডের ওয়াশিং মেশিন আমদানি করা হয়েছে। এর মধ্যে ২০২৪ সালে ৭ হাজার ৫২২টি, ২০২৫ সালে ২০ হাজার ৪৬১টি এবং ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত ৬ হাজার ২৬৪টি আমদানি হয়েছে। আমদানি-সংক্রান্ত তথ্যে ২০২০ সালের ১০ হাজার ৮১৭টি ওয়াশিং মেশিনেরও উল্লেখ রয়েছে।

স্থানীয় উৎপাদনের শর্ত

দেশে এসি, ফ্রিজ ও গৃহস্থালি পণ্যের উৎপাদন বাড়াতে সরকার বিভিন্ন শুল্ক ও ভ্যাট সুবিধা দিয়ে আসছে। শিল্পসংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, এসি উৎপাদনের ক্ষেত্রে নির্ধারিত শর্তের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ পাঁচটি কম্পোনেন্টের অন্তত তিনটি দেশে উৎপাদনের সক্ষমতা থাকার বিষয়টি রয়েছে। এগুলো হলো ইনডোর ইউনিট, আউটডোর ইউনিট, কনডেনসর, এভাপোরেটর এবং সাকশন অ্যান্ড ডিসচার্জ পাইপ।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এ সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রে শুধু উৎপাদনের ঘোষণা যথেষ্ট নয়; প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি, উৎপাদন লাইন ও বাস্তব উৎপাদন সক্ষমতাও থাকতে হয়।

তাদের অভিযোগ, হায়ার বাংলাদেশ এসব সুবিধা নেওয়ার পরও নির্ধারিত কম্পোনেন্ট ও সম্পূর্ণ তৈরি পণ্য বিদেশ থেকে আমদানি করেছে। তবে অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে প্রতিষ্ঠানটির আমদানি ও উৎপাদনসংক্রান্ত নথি যাচাই প্রয়োজন।

দুই ধরনের আইআরসি ব্যবহারের প্রশ্ন

সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, একই ই-টিআইএন ও ঠিকানার অধীনে হায়ার বাংলাদেশের নামে ইন্ডাস্ট্রিয়াল ও কমার্শিয়াল—দুই ধরনের ইমপোর্ট রেজিস্ট্রেশন সার্টিফিকেট (আইআরসি) ব্যবহারের তথ্য পাওয়া গেছে।

শিল্পসংশ্লিষ্টরা বলছেন, কোন আমদানিতে কোন আইআরসি ব্যবহার করা হয়েছে এবং কোনো ক্ষেত্রে রেয়াতি শুল্ক-কর সুবিধা নেওয়া হয়েছে কি না, তা বিল অব এন্ট্রি ও অন্যান্য কাস্টমস নথি যাচাই করা দরকার। তারা হায়ারের আমদানি তথ্য, আইআরসি, উৎপাদন লাইন, কারখানার সক্ষমতা এবং সংশ্লিষ্ট এসআরওর শর্ত পরিপালনের বিষয়টি তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।

স্থানীয় কয়েকটি এসি, ফ্রিজ ও গৃহস্থালি পণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা বলেন, কোনো প্রতিষ্ঠান উৎপাদক হিসেবে শুল্ক-কর সুবিধা নেওয়ার পাশাপাশি তৈরি পণ্য আমদানি ও বাজারজাত করলে স্থানীয় উৎপাদকরা অসম প্রতিযোগিতার মুখে পড়তে পারেন। তাদের মতে, স্থানীয় উৎপাদনে বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানগুলো উৎপাদন লাইন, যন্ত্রপাতি ও প্রযুক্তিতে বড় বিনিয়োগ করে। তৈরি পণ্য আমদানিতে একই ধরনের সুবিধা পাওয়া গেলে উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর খরচের কাঠামোতে বৈষম্য তৈরি হতে পারে।

হায়ারের বক্তব্য পাওয়া যায়নি

অভিযোগের বিষয়ে হায়ার বাংলাদেশের বক্তব্য জানতে রাজধানীর গুলশান-১-এর কনকর্ড টাওয়ারে প্রতিষ্ঠানটির কার্যালয়ে গিয়ে প্রতিবেদক প্রায় দুই ঘণ্টা অপেক্ষা করেন। একজন কর্মী জানান, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা লাঞ্চে গেছেন এবং চাইলে প্রতিবেদক অপেক্ষা করতে পারেন। পরে আর কোনো কর্মকর্তা বক্তব্য দেননি।

তদন্তের আশ্বাস এনবিআরের

এ বিষয়ে এনবিআরের একজন সদস্য বলেন, দেশে শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান ও রপ্তানি বাড়াতে এসি, ফ্রিজ ও গৃহস্থালি পণ্য উৎপাদনে রেয়াতি সুবিধা দেওয়া হচ্ছে। এর অন্যতম প্রধান শর্ত হলো দেশে ফিনিশড গুডস উৎপাদন।

তিনি বলেন, কোনো প্রতিষ্ঠান এসআরওর শর্ত ভেঙে কাঁচামাল বা যন্ত্রপাতির নামে ফিনিশড গুডস আমদানি করে সুবিধা নিলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। হায়ার বাংলাদেশ এমন সুবিধা নিয়েছে কি না, তা তদন্ত করে দেখা হবে।

ফিনিশড গুডসকে ক্যাপিটাল মেশিনারিজ হিসেবে ঘোষণা দেওয়ার সুযোগ নেই বলেও ওই কর্মকর্তা জানান। কাস্টমস ও সংশ্লিষ্ট ভ্যাট কমিশনারেট নথি যাচাই করে অভিযোগের সত্যতা পেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেবে বলেও তিনি জানান।


Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top