‘ফ্যাসিবাদের পদধ্বনি শুনতে পাচ্ছি’: ১১ দলীয় জোটের লংমার্চে শফিকুর রহমান

‘ফ্যাসিবাদের পদধ্বনি শুনতে পাচ্ছি’: ১১ দলীয় জোটের লংমার্চে শফিকুর রহমান
শফিকুর রহমান / ছবি: সংগৃহীত

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা: দেশে আবারও ফ্যাসিবাদের পরিবেশ তৈরি হচ্ছে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন জামায়াতে ইসলামী আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান। তিনি বলেছেন, জনগণের অধিকার নিয়ে ছিনিমিনি খেললে কোনো সরকারই শেষ পর্যন্ত রেহাই পাবে না।

শনিবার ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক হয়ে চট্টগ্রামে আয়োজিত ১১ দলীয় জোটের লংমার্চের সমাপনী সমাবেশে তিনি এসব কথা বলেন। চট্টগ্রামের লালদীঘি ময়দানে আয়োজিত সমাবেশে জোটের শীর্ষ নেতারাও সরকারের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করেন।

শফিকুর রহমান বলেন, বিএনপি তাদের ৩১ দফা নির্বাচনী কর্মসূচিতে স্থানীয় পর্যায়ে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে রাষ্ট্র পরিচালনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। কিন্তু বর্তমানে বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় ও প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠানে দলীয় লোকজনকে নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে বলে তিনি অভিযোগ করেন।

“এটা কি গণতন্ত্র, নাকি ফ্যাসিবাদ?”—সমাবেশে প্রশ্ন রাখেন তিনি।

সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন করলেও এই মুহূর্তে সরকারকে সরিয়ে দেওয়ার লক্ষ্য তাদের নেই জানিয়ে শফিকুর বলেন, সরকারের কর্মকাণ্ডই একসময় তাদের পতনের পথ তৈরি করতে পারে।

ছয় দফা দাবি নিয়ে রাজপথে জোট

জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট ছয়টি প্রধান দাবি সামনে রেখে এই কর্মসূচি পালন করছে। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে গণভোটের রায় বাস্তবায়ন, জুলাই গণহত্যার বিচার, বিদ্যুৎ-গ্যাস-জ্বালানি ও সারের সংকট নিরসন, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণ, আইনশৃঙ্খলার উন্নতি এবং প্রশাসনে রাজনৈতিক প্রভাব বন্ধ করা।

এর পাশাপাশি চাঁদাবাজি ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিও জানিয়েছে জোটটি।

লংমার্চটি ঢাকার মতিঝিলের শাপলা চত্বর থেকে শুরু হয়। পরে নারায়ণগঞ্জের শিমরাইল, কুমিল্লার পদুয়ার বাজার, ফেনীর মহিপাল হয়ে চট্টগ্রামে পৌঁছায় নেতাকর্মীদের বহর।

জামায়াতের মিডিয়া সেল জানিয়েছে, কর্মসূচিতে প্রায় ১,৫০০ যানবাহন অংশ নেয়। বিপুলসংখ্যক গাড়ির কারণে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কয়েকটি স্থানে যানজটের সৃষ্টি হয়। তবে জনদুর্ভোগ কমাতে মহাসড়কের একটি পাশ ব্যবহার করার কথা জানিয়েছিলেন আয়োজকরা।

‘জনগণের রায় বাস্তবায়ন করতে রাজপথে নেমেছি’

নারায়ণগঞ্জের শিমরাইলে বক্তব্য দেওয়ার সময় শফিকুর রহমান বলেন, জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানের চেতনা এবং গণভোটের রায় বাস্তবায়নের দাবিতেই তারা মাঠে নেমেছেন।

তিনি বলেন, জনগণের ঘরে গ্যাস ও বিদ্যুৎ নিশ্চিত করাসহ মৌলিক সমস্যার সমাধানের দাবিও তাদের আন্দোলনের অন্যতম উদ্দেশ্য।

জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, দেশের চলমান সংকট একা সরকারের পক্ষে সমাধান করা সম্ভব নয়। এ জন্য বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর সহযোগিতা প্রয়োজন।

তিনি বলেন, জ্বালানি, গ্যাস ও বিদ্যুতের সরবরাহ নিশ্চিত করতে না পারলে সরকারের পক্ষে ক্ষমতায় টিকে থাকা কঠিন হবে।

‘সরকার পতনের আন্দোলন নয়, সতর্কবার্তা’

কুমিল্লার পদুয়ার বাজারে জামায়াতের নায়েবে আমির সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের বলেন, এই লংমার্চ সরকারের পদত্যাগের দাবিতে নয়; বরং সরকারকে সতর্ক করার জন্য।

তিনি সরকারের প্রতি জনগণের উত্থাপিত সমস্যাগুলো সমাধানে বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা নেওয়ার আহ্বান জানান।

নাহিদ ইসলাম সরকারের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও বিভিন্ন সিন্ডিকেটে মন্ত্রীদের পরিবারের সদস্যদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ তোলেন। তিনি বলেন, নির্বাচনের আগে দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়নে সরকার ব্যর্থ হয়েছে।

ছয় দফা দাবি পূরণ না হলে তা এক দফা দাবিতে পরিণত হতে পারে বলেও সতর্ক করেন তিনি।

বিদ্যুৎ সংকট নিয়ে ক্ষোভ

ফেনীর মহিপালে শফিকুর রহমান সরকারের বিদ্যুৎ পরিস্থিতির সমালোচনা করেন। তিনি অভিযোগ করেন, সাধারণ মানুষ বিদ্যুৎ সংকটে ভুগলেও ক্ষমতাসীনদের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোতে বিদ্যুৎ সরবরাহে সমস্যা নেই।

“বিদ্যুৎমন্ত্রীর বাড়িতে বিদ্যুৎ আছে। সংসদে বিদ্যুৎ আছে। অথচ সাধারণ মানুষের ঘরে বিদ্যুৎ নেই,” বলেন তিনি।

এ সময় শাপলা চত্বর ও পিলখানাসহ বিভিন্ন ঘটনায় সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের বিচার প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন তোলেন জামায়াত আমির।

‘যেখানেই বাধা, সেখানেই প্রতিরোধ’

মহিপালের সমাবেশে শফিকুর রহমান সরকারের বিরুদ্ধে জনগণের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতার অভিযোগ করেন।

তিনি বলেন, “এই সরকার জনগণের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা শুরু করেছে। আমরা ফ্যাসিবাদের পদধ্বনি শুনতে পাচ্ছি।”

তিনি আরও বলেন, যারা দেশে আবারও ফ্যাসিবাদ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করবে, তাদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিকভাবে প্রতিরোধ গড়ে তোলা হবে।

“আমরা কারও ভয়ভীতি সহ্য করব না। যেখানে বাধা আসবে, সেখানেই প্রতিরোধ গড়ে তুলব,” বলেন তিনি।

চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার সরকারের ফ্যামিলি কার্ড ও ফার্মার্স কার্ড কর্মসূচির সমালোচনা করেন।

তিনি বলেন, সরকারের হাতে দুটি কার্ড থাকলেও জনগণের হাতে রয়েছে ‘লাল কার্ড’। খুব শিগগিরই জনগণ সেই কার্ড দেখাবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

সমাপনী সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) সভাপতি কর্নেল (অব.) অলি আহমদ। তিনি সরকারের স্থায়িত্ব নিয়েও প্রশ্ন তোলেন এবং বিভিন্ন স্থানীয় প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠানে দলীয় লোকজন নিয়োগের অভিযোগ করেন।

তিনি প্রশ্ন করেন, রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োগ দেওয়া হলে প্রশাসনে জবাবদিহি ও গণতন্ত্র কতটা কার্যকর থাকবে।


Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top