রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদল-ছাত্রশিবির সংঘর্ষ: পাল্টাপাল্টি ধাওয়া, ইটপাটকেল নিক্ষেপে উত্তেজনা, তদন্তের ঘোষণা

রংপুর: বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে (বেরোবি) বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল ও বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের নেতা-কর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এ সময় উভয় পক্ষের মধ্যে পাল্টাপাল্টি ধাওয়া, ইটপাটকেল নিক্ষেপ, চেয়ার ছোড়াছুড়ি এবং হাতাহাতির ঘটনা ঘটে। সংঘর্ষে দুই পক্ষের বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। ঘটনার পর ক্যাম্পাসজুড়ে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে এবং রাত পর্যন্ত দুই সংগঠনের নেতা-কর্মীরা পৃথক অবস্থানে অবস্থান করেন।
সোমবার (৩ আগস্ট) সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে এ সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়। রাত প্রায় পৌনে ১১টা পর্যন্ত পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। এ সময় ছাত্রশিবিরের নেতা-কর্মীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ফটকের সামনে এবং ছাত্রদলের নেতা-কর্মীরা পার্কের মোড়সংলগ্ন মসজিদের সামনে অবস্থান নেন। পরে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতিতে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে।
প্রদর্শনী ঘিরেই উত্তেজনার সূচনা
প্রত্যক্ষদর্শী ও সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, দিনব্যাপী বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রশিবিরের উদ্যোগে ‘জুলাই জুলুমের বিরুদ্ধে জুলাই’ শীর্ষক একটি প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়েছিল। প্রদর্শনীতে ‘বিচারিক হত্যাকাণ্ড (জুডিশিয়াল কিলিং)’ শিরোনামে কয়েকজন ব্যক্তির ছবি ও তথ্য প্রদর্শন করা হয়।
এ সময় বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের নেতা-কর্মীরা প্রদর্শনীস্থলে গিয়ে ব্যানারের কিছু ছবি অপসারণের দাবি জানান। এ নিয়ে দুই সংগঠনের নেতা-কর্মীদের মধ্যে প্রথমে মৌখিক বাকবিতণ্ডা শুরু হয়। একপর্যায়ে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে এবং উভয় পক্ষ সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে।
দফায় দফায় ধাওয়া ও সংঘর্ষ
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, সংঘর্ষের সময় দুই পক্ষ লাঠিসোঁটা নিয়ে একে অপরকে ধাওয়া করে। পাশাপাশি ইটপাটকেল নিক্ষেপ, চেয়ার ছোড়াছুড়ি এবং হাতাহাতির ঘটনাও ঘটে। এতে উভয় সংগঠনের কয়েকজন নেতা-কর্মী আহত হন। তবে আহতদের সুনির্দিষ্ট সংখ্যা তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত করা যায়নি।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে ছুটে যান। পরে পুলিশও ক্যাম্পাসে উপস্থিত হয়ে নিরাপত্তা জোরদার করে।
ছাত্রশিবিরের বক্তব্য
বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রশিবিরের দপ্তর সম্পাদক শিবলী সাদিক দাবি করেন, তাঁদের প্রদর্শনীতে থাকা কিছু ছবি সরিয়ে নেওয়ার জন্য ছাত্রদল চাপ সৃষ্টি করে। তিনি বলেন, এ বিষয়ে তাঁরা ছাত্রদলকে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনা করার পরামর্শ দেন, কারণ প্রদর্শনী অপসারণের সিদ্ধান্ত প্রশাসনের নেওয়ার কথা।
শিবলী সাদিকের অভিযোগ, প্রশাসনের সিদ্ধান্তের অপেক্ষা না করে ছাত্রদলের নেতা-কর্মীরা তাঁদের ওপর অতর্কিত হামলা চালান। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, সংগঠনের সভাপতির ওপর হামলার চেষ্টা হলে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। পরে প্রক্টরের উপস্থিতিতে পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হলেও ছাত্রদল পুনরায় হামলা চালায় বলে তিনি অভিযোগ করেন। তাঁর দাবি, ওই সময় লাঠিসোঁটা ও ইটপাটকেল ব্যবহার করা হয় এবং আত্মরক্ষার্থে তাঁরাও প্রতিরোধ গড়ে তোলেন।
ছাত্রদলের বক্তব্য
অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের সভাপতি মো. ইয়ামিন বলেন, প্রদর্শনীতে মুক্তিযুদ্ধবিরোধী কর্মকাণ্ডের অভিযোগে পরিচিত কয়েকজন ব্যক্তির ছবি সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার ছবির পাশে প্রদর্শন করা হয়েছিল। বিষয়টি তাঁদের দৃষ্টিগোচর হলে তাঁরা সংশ্লিষ্ট ছবি সরিয়ে নেওয়ার অনুরোধ জানান।
তাঁর দাবি, ছবি অপসারণের বিষয়টি বলার পর ছাত্রশিবিরের নেতা-কর্মীরা চেয়ার নিক্ষেপ শুরু করেন। এতে ধাক্কাধাক্কি ও সংঘর্ষের সৃষ্টি হয় এবং তাঁদের একজন আহত হন।
ছাত্রদলের সভাপতির আরও অভিযোগ, ছাত্রশিবির ক্যাম্পাসের বাইরে থেকে অতিরিক্ত নেতা-কর্মী এনে হামলা চালিয়েছে। একই সঙ্গে তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধ ও জুলাই আন্দোলন-সংক্রান্ত বিষয়ে তাঁদের সংগঠন কোনো ধরনের আপস করবে না।
প্রশাসনের অবস্থান
ঘটনার পর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ফেরদৌস রহমান জানান, সংঘর্ষের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের ভিডিও ফুটেজ ও অন্যান্য তথ্য-প্রমাণ বিশ্লেষণ করে শনাক্ত করা হবে। তাঁদের বিরুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
তিনি আরও বলেন, পুরো ঘটনার তদন্তে একটি কমিটি গঠন করা হবে। তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে দায়ীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
পুলিশের বক্তব্য
রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের তাজহাট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রফিকুল ইসলাম জানান, ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের নেতা-কর্মীদের মধ্যে হাতাহাতি ও সংঘর্ষের খবর পেয়ে পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে।
তিনি বলেন, পুলিশের উপস্থিতিতে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে এবং বর্তমানে ক্যাম্পাসে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে। একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য দুই সংগঠনের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকদের নিয়ে বৈঠক করেছেন বলেও তিনি জানান।
ক্যাম্পাসে নিরাপত্তা জোরদার
সংঘর্ষের পর বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে অতিরিক্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। প্রশাসন শিক্ষার্থীদের শান্ত থাকার আহ্বান জানিয়েছে এবং গুজব বা উসকানিমূলক তথ্য প্রচার থেকে বিরত থাকার অনুরোধ করেছে।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন জানিয়েছে, তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন করে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে এ ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি এড়াতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের কথাও জানানো হয়েছে।



