গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট: এফএসআরইউ মেরামত না হওয়া পর্যন্ত লোডশেডিং ব্যবস্থাপনা ছাড়া উপায় নেই

ঢাকা, ১৩ আগস্ট ২০২৬: দেশের চলমান গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলায় আপাতত লোডশেডিং ব্যবস্থাপনা এবং ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল (এফএসআরইউ) মেরামত শেষ হওয়ার অপেক্ষা করা ছাড়া সরকারের হাতে কার্যকর কোনো বিকল্প নেই বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ।
বৃহস্পতিবার রাজধানীর মহাখালীতে ব্র্যাক সেন্টারে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) আয়োজিত ‘নেভিগেটিং বাংলাদেশ এনার্জি ক্রাইসিস: ইমিডিয়েট প্রায়োরিটিজ অ্যান্ড দ্য পাথ টু এ সাসটেইনেবল এনার্জি ফিউচার’ শীর্ষক সংলাপে অনলাইনে যুক্ত হয়ে তিনি এ কথা বলেন।
মন্ত্রী বলেন, এফএসআরইউ সচল না থাকায় বর্তমানে গ্যাস সরবরাহ বাড়ানোর সুযোগ সীমিত। একই সঙ্গে নতুন করে দ্রুত দেশীয় গ্যাস উত্তোলন করাও সম্ভব নয়। ফলে প্রকৌশলীরা টার্মিনালটির মেরামত শেষ না করা পর্যন্ত অপেক্ষার পাশাপাশি লোডশেডিং কমানোর জন্য বিদ্যমান গ্যাস ও বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনা করতে হচ্ছে।
তিনি বলেন, শিল্প খাতে যতটা সম্ভব গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করার চেষ্টা চলছে। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে সংকট পুরোপুরি এড়ানোর মতো কার্যকর বিকল্প সরকারের হাতে নেই।
এফএসআরইউ মেরামতে যুক্তরাজ্য ও সিঙ্গাপুরের প্রকৌশলী
মন্ত্রী জানান, আগুনের ঘটনার পর এফএসআরইউ মেরামতের কাজ চলছে। যুক্তরাজ্য ও সিঙ্গাপুরের প্রকৌশলীরা মেরামত কার্যক্রমে যুক্ত রয়েছেন।
তবে মেরামত শেষে নতুন দুটি বয়লার একসঙ্গে চালু করতে হবে। এ সময় কারিগরি সমন্বয়ের জন্য পুরো সিস্টেম প্রায় ৭২ ঘণ্টা বা তিন দিন বন্ধ রাখতে হতে পারে। এতে মেরামত শেষ হওয়ার পরও সাময়িকভাবে দেশে গ্যাসের সংকট আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
২০২৯ সালের মধ্যে আরও তিন এফএসআরইউ
গ্যাসের ক্রমবর্ধমান চাহিদা মোকাবিলায় ২০২৯ সালকে সামনে রেখে অবকাঠামো উন্নয়নের পরিকল্পনা করছে সরকার বলে জানান মন্ত্রী।
তিনি বলেন, ইতোমধ্যে একটি নতুন এফএসআরইউর অর্ডার দেওয়া হয়েছে। ২০২৯ সালের মধ্যে পায়রা, মোংলা ও হিরণ পয়েন্টে আরও তিনটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে।
শিল্প খাতে গ্যাসের সংকট কমাতে ভোলা থেকে কনটেইনার ট্রাকে করে গ্যাস সরবরাহের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। এ জন্য একটি কোম্পানিকে ৩০টি ট্রাক পরিচালনার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি কনটেইনারের মাধ্যমে সরাসরি গ্যাস সরবরাহের অবকাঠামো তৈরিতে মালয়েশিয়ার একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলোচনা চলছে।
গ্যাস সংকটে শিল্প উৎপাদন কমেছে ৩৫-৪০ শতাংশ
বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের (বিসিআই) সভাপতি আনোয়ার উল আলম চৌধুরী পারভেজ বলেন, তীব্র গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট কারণে দেশের শিল্পকারখানাগুলোর উৎপাদন ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে।
তিনি বলেন, সংকটের কারণে শিল্প খাত গভীর চাপের মধ্যে রয়েছে। বিশেষ করে সংকটের খবর আন্তর্জাতিকভাবে ছড়িয়ে পড়ায় তৈরি পোশাক খাতের বিদেশি ক্রয়াদেশ হারানোর ঝুঁকি বাড়ছে।
উচ্চ হারে বিল পরিশোধ করেও সময়মতো জ্বালানি না পাওয়ায় ব্যবসায়ীরা ব্যাংকঋণ খেলাপি হওয়ার আশঙ্কায় রয়েছেন উল্লেখ করে তিনি শিল্প খাতে গ্যাস সরবরাহকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার দাবি জানান। একই সঙ্গে ব্যবসা ও কর্মসংস্থান রক্ষায় জরুরি ‘রেসকিউ প্যাকেজ’ দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার সমালোচনা
সিপিডির সিনিয়র গবেষণা সহযোগী ফখরুদ্দিন আল কবির মূল প্রবন্ধে বলেন, দেশের বর্তমান জ্বালানি সংকটের অন্যতম কারণ অতিরিক্ত আমদানিনির্ভরতা ও দীর্ঘদিনের কাঠামোগত দুর্বলতা।
তার উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, দেশে ব্যবহৃত বিদ্যুতের প্রায় ৮৪ শতাংশ জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে আসে। বিপরীতে নবায়নযোগ্য জ্বালানির অবদান মাত্র ৪ দশমিক ৫ শতাংশ। ফলে আমদানিনির্ভরতা বাড়ার পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ তৈরি হচ্ছে।
সংকট মোকাবিলায় জরুরি ভিত্তিতে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান বাড়ানো, সৌর ও অন্যান্য নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার সম্প্রসারণ এবং কৌশলগত জ্বালানি মজুত বা স্ট্র্যাটেজিক ফুয়েল রিজার্ভ গড়ে তোলার সুপারিশ করেছে সিপিডি।
আমদানিকৃত জ্বালানির আন্তর্জাতিক মূল্য ওঠানামার প্রভাব মোকাবিলা এবং নিম্নআয়ের জনগোষ্ঠীকে সুরক্ষা দিতে লক্ষ্যভিত্তিক নীতিমালা প্রণয়নেরও আহ্বান জানানো হয়।
শিল্পে অগ্রাধিকার চায় ব্যবসায়ী মহল
সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন বলেন, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলায় সাময়িক পদক্ষেপের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত নীতি প্রয়োজন।
তিনি বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে ১০ বছর মেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন। বাজারভিত্তিক জ্বালানি মূল্যনীতি ও লক্ষ্যভিত্তিক ভর্তুকির অভাব সংকটকে আরও গভীর করেছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
শিল্প, কৃষি ও সাধারণ মানুষের ওপর সংকটের চাপ কমাতে সুশাসনের ঘাটতি ও দীর্ঘদিনের সংস্কারহীনতা দূর করে দ্রুত দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান ফাহমিদা খাতুন।
গ্যাসের অভাবে বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ
বাংলাদেশ ইনডিপেনডেন্ট পাওয়ার প্রডিউসার অ্যাসোসিয়েশনের (বিপ্পা) সভাপতি ডেভিড হাসনাত বলেন, গ্যাসের তীব্র ঘাটতির কারণে দেশের বড় একটি অংশের গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র টানা বন্ধ রাখতে হচ্ছে।
দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন দ্রুত কমে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হচ্ছে উল্লেখ করে তিনি দ্রুত সংকট মোকাবিলায় স্থলভিত্তিক এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের পরামর্শ দেন। তার মতে, নতুন ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণে সময় লাগায় দীর্ঘমেয়াদে ল্যান্ডবেজড টার্মিনাল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে জোর
বাংলাদেশ সাসটেইনেবল অ্যান্ড রিনিউয়েবল এনার্জি অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোস্তফা আল মাহমুদ দেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর আহ্বান জানান।
তিনি বলেন, সৌরবিদ্যুৎ ও স্টোরেজ প্রযুক্তি সম্প্রসারণে কাস্টমস ও প্রশাসনিক জটিলতা কমাতে হবে। বন্দরে পণ্য খালাসের প্রক্রিয়া সহজ করার পাশাপাশি স্টোরেজ প্রযুক্তিতে শুল্ক সুবিধা দেওয়া প্রয়োজন।
দেশের প্রায় ১৩ লাখ ডিজেলচালিত সেচপাম্প সৌরবিদ্যুতে রূপান্তর করা গেলে জ্বালানি ব্যয় কমানোর পাশাপাশি দ্রুত সাশ্রয় সম্ভব বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
রাত ১২টার পর ব্যাটারিচালিত রিকশা চার্জ নিয়ে উদ্বেগ
ব্যাটারিচালিত রিকশার বিদ্যুৎ ব্যবহার নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন মন্ত্রী। তিনি এগুলোকে ‘গরিবের টেসলা’ হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, অনেক রিকশা রাত ১২টার পর অবৈধ সংযোগের মাধ্যমে চার্জ দেওয়া হয়।
এর ফলে বিদ্যুতের সর্বোচ্চ চাহিদার সময় পরিবর্তিত হয়ে গভীর রাতেও চাহিদা বাড়ছে এবং মোট বিদ্যুৎ চাহিদা প্রায় ১৮ হাজার মেগাওয়াটে পৌঁছাচ্ছে বলে জানান তিনি।
অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করতে গিয়ে বিভিন্ন এলাকায় সরকারি কর্মচারীরা হামলার শিকার হচ্ছেন বলেও মন্ত্রী উল্লেখ করেন।
তেল আমদানিতে নতুন নীতির উদ্যোগ
তেল নিয়ে বিভিন্ন সময় ছড়ানো গুজব সংকটকে আরও জটিল করে বলে মন্তব্য করেন মন্ত্রী। তিনি বলেন, কোনো নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে তেল ব্যবসায় একচেটিয়া সুবিধা দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়নি।
নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ করে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো যাতে তেল আমদানি করতে পারে, সে জন্য নতুন নীতিমালা প্রণয়নের কাজ চলছে বলেও জানান তিনি।
সৌরবিদ্যুৎ প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, সোলার ব্যাটারি ও ইনভার্টারের আমদানি শুল্ক কমিয়ে ৫ শতাংশ করা হয়েছে। এ ছাড়া নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে পাঁচ বছরের করছাড়ের সুবিধা দেওয়া হয়েছে।
সংকট সমাধানে চাহিদা ব্যবস্থাপনার ওপরও জোর
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ইজাজ হোসেন দেশের বর্তমান সংকটের পেছনে অতিরিক্ত সামাজিক প্রতিশ্রুতি, বাস্তবসম্মত মূল্যনীতির অভাব এবং সিস্টেম লসকে দায়ী করেন।
তিনি বলেন, বছরের পর বছর সমস্যাগুলো জমতে দেওয়ার কারণে সংকট এখন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে শুধু সরবরাহ বাড়িয়ে এর সমাধান করা সম্ভব নয়। সরবরাহ বৃদ্ধির পাশাপাশি বিদ্যুতের চাহিদা নিয়ন্ত্রণেও গুরুত্ব দিতে হবে।
সাশ্রয়ী মূল্যে বিদ্যুৎ সরবরাহ ও আবাসিক খাতে ভর্তুকি মূল্যে গ্যাস দেওয়ার দীর্ঘদিনের নীতির কারণে সরকার বড় অর্থনৈতিক চাপে পড়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তার মতে, বাস্তবভিত্তিক মূল্য নির্ধারণ এবং জ্বালানি চুরি বন্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি শিল্প খাতকে ভবিষ্যৎ জ্বালানি পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত হতে হবে।
শিল্পে নির্ভরযোগ্য জ্বালানি সরবরাহের দাবি
সিপিডির বোর্ড অব ট্রাস্টিজের সদস্য সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর বলেন, জ্বালানি সংকটে শিল্প উৎপাদন ও দেশের রপ্তানি সক্ষমতা মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
তিনি শিল্প খাতে নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করতে সরকারের সুস্পষ্ট অগ্রাধিকার নির্ধারণের দাবি জানান। একই সঙ্গে লোডশেডিংয়ের নির্দিষ্ট সময়সূচি প্রকাশ, সিস্টেম লস কমানো এবং শিল্প খাতে জ্বালানি সরবরাহে অগ্রাধিকার দেওয়ার আহ্বান জানান।
সোলার স্টোরেজে করছাড় দেওয়ার বিষয়েও তিনি গুরুত্বারোপ করেন।
দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ওপর গুরুত্ব
সংলাপে বক্তারা বলেন, বর্তমান গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট শুধু সাময়িক সরবরাহ ঘাটতির বিষয় নয়; এর সঙ্গে দেশের জ্বালানি নীতি, আমদানিনির্ভরতা, মূল্য নির্ধারণ, অবকাঠামো, সিস্টেম লস এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসারের মতো দীর্ঘমেয়াদি বিষয় জড়িত।
মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেন, শিল্পকারখানা বন্ধ থাকলে শ্রমিকদের বেতন এবং ব্যাংকঋণের কিস্তি পরিশোধের চাপ সম্পর্কে তিনি নিজেও একজন উদ্যোক্তা হিসেবে অবগত। তাই সংকট মোকাবিলায় সরকার সর্বাত্মক চেষ্টা করছে।
তিনি জানান, আগামী সংসদ অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী ২০২৯ সালের মধ্যে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের পূর্ণাঙ্গ ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা জাতির সামনে তুলে ধরবেন।
সংলাপে আরও বক্তব্য দেন নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক সাকিব বিন আমিন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেমস বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মোশাহিদা সুলতানাসহ সংশ্লিষ্ট খাতের বিশেষজ্ঞ ও প্রতিনিধিরা।



