ছাত্রদল নেতা জাহিদুল ইসলাম পারভেজ হত্যা মামলা: অধিকতর তদন্তের নির্দেশ দিল আদালত, তদন্ত করবে সিআইডি
বনানীর প্রাইম এশিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হত্যাকাণ্ডে নতুন মোড়, ৭ সেপ্টেম্বরের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ

ঢাকা, মঙ্গলবার: রাজধানীর বনানীতে প্রাইম এশিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও ছাত্রদলের কর্মী জাহিদুল ইসলাম পারভেজ হত্যা মামলায় নতুন মোড় এসেছে। মামলার তদন্ত নিয়ে বাদীপক্ষের আপত্তি গ্রহণ করে ঢাকার একটি আদালত পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগকে (সিআইডি) অধিকতর তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন। একই সঙ্গে আগামী ৭ সেপ্টেম্বর এর মধ্যে নতুন তদন্ত প্রতিবেদন আদালতে জমা দেওয়ার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে।
মঙ্গলবার ঢাকার অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. সেফাতুল্লাহ-এর আদালতে বাদীপক্ষের দায়ের করা নারাজি আবেদনের শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। শুনানি শেষে আদালত মামলার বিদ্যমান তদন্তে সন্তুষ্ট না হয়ে অধিকতর তদন্তের নির্দেশ দেন।
শুনানি শেষে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী হারুন অর রশীদ বিষয়টি গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেন।
অভিযোগপত্র নিয়ে অসন্তোষ, আদালতে নারাজি আবেদন
আদালত সূত্রে জানা যায়, মামলার তদন্ত শেষে বনানী থানা পুলিশ আদালতে অভিযোগপত্র জমা দিলেও বাদীপক্ষ তাতে সন্তুষ্ট ছিল না। তাদের অভিযোগ, তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ কিছু বিষয় যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা হয়নি এবং কয়েকজন সম্ভাব্য অভিযুক্তকে অব্যাহতি দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে, যা ঘটনার প্রকৃত বিচার নিশ্চিত করতে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে পারে।
এ কারণে নিহত শিক্ষার্থীর পরিবারের পক্ষ থেকে আদালতে নারাজি আবেদন করা হয়। বাদীপক্ষের আইনজীবী মোহাম্মদ আবজাল হোসেন মৃধা শুনানিতে অধিকতর তদন্তের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে আদালতের কাছে মামলাটি সিআইডির কাছে হস্তান্তরের আবেদন জানান।
উভয় পক্ষের বক্তব্য শুনে আদালত মামলাটি পুনঃতদন্তের জন্য পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগকে (সিআইডি) দায়িত্ব দেন।
কী ঘটেছিল পারভেজ হত্যা মামলায়?
মামলার নথি অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ১৯ এপ্রিল বিকেলে রাজধানীর বনানীতে অবস্থিত প্রাইম এশিয়া বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ইংরেজি বিভাগ এবং টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষার্থীদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।
সংঘর্ষ চলাকালে টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষার্থী জাহিদুল ইসলাম পারভেজ ছুরিকাঘাতে গুরুতর আহত হন। পরে তাকে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
নিহত পারভেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ২২৩ ব্যাচের শিক্ষার্থী ছিলেন। তাঁর বয়স ছিল ২২ বছর এবং বাড়ি ময়মনসিংহ জেলায়।
ঘটনার পর বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস এবং শিক্ষার্থীদের মধ্যে ব্যাপক উদ্বেগ ও প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
হত্যার পরদিন মামলা দায়ের
পারভেজ নিহত হওয়ার পরদিন তাঁর ফুফাতো ভাই হুমায়ন কবীর বনানী থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন।
প্রাথমিকভাবে মামলায় পাঁচজনকে আসামি করা হয়। তদন্তের অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে আরও তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহের ভিত্তিতে অভিযুক্তের সংখ্যা বৃদ্ধি পায়।
পুলিশের অভিযোগপত্রে ৯ জন অভিযুক্ত
তদন্ত শেষে বনানী থানার পরিদর্শক (তদন্ত) এ কে এম মঈন উদ্দিন গত ২৯ এপ্রিল আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেন।
অভিযোগপত্রে মোট নয়জনকে অভিযুক্ত করা হয়। তারা হলেন—
- মেহেরাজ ইসলাম
- আবু জহর গিফফারি (পিয়াস)
- মাহাথির হাসান
- আল কামাল শেখ (কামাল)
- আলভী হোসেন জুনায়েদ
- আল আমিন সানি
- ফাতেমা তাহসিন
- ফারিয়া হক টিনা
- রাকিব
তদন্ত কর্মকর্তা অভিযোগপত্রে উল্লেখ করেন, তদন্তে সংগৃহীত সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে এই ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে।
আটজনকে অব্যাহতির সুপারিশ
একই অভিযোগপত্রে পর্যাপ্ত প্রমাণ না পাওয়ার কথা উল্লেখ করে আটজনকে মামলার দায় থেকে অব্যাহতির সুপারিশ করা হয়।
অব্যাহতির সুপারিশ পাওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের বনানী থানার যুগ্ম আহ্বায়ক সোবহান নিয়াজ তুষার-এর নামও রয়েছে।
এই অংশটিই মূলত বাদীপক্ষের আপত্তির অন্যতম কারণ হিসেবে আদালতে উপস্থাপন করা হয়।
কেন সিআইডিকে তদন্তের দায়িত্ব?
বাদীপক্ষের দাবি, মামলার প্রকৃত ঘটনা উদঘাটনের স্বার্থে আরও নিরপেক্ষ ও বিস্তৃত তদন্ত প্রয়োজন। তাদের মতে, বিদ্যমান তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য, সাক্ষ্য এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা হয়নি।
আদালতও সেই যুক্তি বিবেচনা করে মামলাটি অধিকতর তদন্তের জন্য সিআইডির কাছে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেন।
বাংলাদেশে জটিল বা গুরুত্বপূর্ণ অপরাধমূলক মামলায় অতিরিক্ত তদন্তের প্রয়োজন হলে আদালত প্রয়োজনে সিআইডিকে তদন্তের দায়িত্ব দিতে পারেন। সিআইডি পুনরায় সাক্ষ্যগ্রহণ, আলামত বিশ্লেষণ, ডিজিটাল তথ্য সংগ্রহ এবং অন্যান্য প্রমাণ যাচাই করে নতুন তদন্ত প্রতিবেদন আদালতে জমা দেয়।
৭ সেপ্টেম্বরের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ
আদালত সিআইডিকে আগামী ৭ সেপ্টেম্বর এর মধ্যে অধিকতর তদন্ত সম্পন্ন করে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।
নতুন তদন্তে যদি অতিরিক্ত তথ্য-প্রমাণ বা নতুন কোনো অভিযুক্তের সম্পৃক্ততা উঠে আসে, তাহলে সিআইডি তা আদালতের সামনে উপস্থাপন করতে পারবে। একইভাবে, পূর্ববর্তী তদন্তের তথ্য-প্রমাণও পুনরায় যাচাই করা হবে।
মামলার পরবর্তী কার্যক্রম এখন সিআইডির তদন্ত প্রতিবেদনের ওপর নির্ভর করবে। প্রতিবেদন জমা দেওয়ার পর আদালত পরবর্তী আইনগত পদক্ষেপ নির্ধারণ করবেন।



