জর্জিনাকে বিয়ে করলেন ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো, পূর্ণতা পেল ১০ বছরের প্রেম
দীর্ঘ এক দশকের সম্পর্কের পর জর্জিনা রদ্রিগেজকে বিয়ে করলেন পর্তুগিজ ফুটবল কিংবদন্তি ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো। কাসকাইসে ঘরোয়া আয়োজনে সম্পন্ন হয়েছে তাঁদের বিয়ের অনুষ্ঠান।

এএফপি
দীর্ঘদিনের প্রেমের সম্পর্কে এবার আনুষ্ঠানিকভাবে স্বামী-স্ত্রী হলেন ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো ও জর্জিনা রদ্রিগেজ। পর্তুগালের সৈকতঘেরা শহর কাসকাইসে মঙ্গলবার পারিবারিক ও একান্ত ব্যক্তিগত আয়োজনে বিয়ে করেছেন পর্তুগিজ ফুটবল কিংবদন্তি। এর মধ্য দিয়ে প্রায় এক দশকের সম্পর্ক নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করল।
৪১ বছর বয়সী রোনালদোর বিয়ের খবর তাঁর প্রতিনিধিরাও নিশ্চিত করেছেন। ব্রান্সউইক গ্রুপ, যেটি রোনালদোর জনসংযোগের দায়িত্বে রয়েছে, বার্তা সংস্থা এএফপিকে জানিয়েছে, বিয়ের অনুষ্ঠানটি ছিল সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত ও ঘরোয়া। অনুষ্ঠানে রোনালদো ও জর্জিনার পাঁচ সন্তানও উপস্থিত ছিল।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিয়ের ঘোষণা
বিয়ের খবর প্রকাশ্যে আসার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভক্তদের মধ্যে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। বাংলাদেশ সময় মঙ্গলবার রাতে রোনালদো নিজেই একটি ছবি পোস্ট করেন। ছবিতে দেখা যায়, জর্জিনার হাতের ওপর রাখা রোনালদোর হাত এবং দুজনের অনামিকায় বিয়ের আংটি।
ছবির সঙ্গে রোনালদো ক্যাপশনে ‘C’ ও ‘G’ অক্ষর ব্যবহার করেন, যার মাঝখানে ছিল ভালোবাসার প্রতীক। আনুষ্ঠানিকভাবে দীর্ঘ কোনো বক্তব্য না দিলেও ছবিটিই তাঁদের বিয়ের খবর নিশ্চিত করার জন্য যথেষ্ট ছিল।
এর আগে ২০২৫ সালের ১১ আগস্ট জর্জিনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁদের বাগদানের খবর জানিয়েছিলেন। সে সময় রোনালদোর হাতের ওপর নিজের হাত রেখে অনামিকায় বড় একটি আংটি পরা ছবি প্রকাশ করেছিলেন তিনি। এক বছর পর প্রায় একই আবহের ছবিতে এবার দেখা গেল উল্টো দৃশ্য—জর্জিনার হাতের ওপর রোনালদোর হাত, দুজনের হাতেই বিয়ের আংটি।

কাসকাইসেই কেন বেছে নিলেন বিয়ের ভেন্যু?
রোনালদোর বিয়ের স্থান নিয়ে বেশ কিছুদিন ধরেই নানা গুঞ্জন চলছিল। পর্তুগিজ সংবাদমাধ্যমের খবরে সম্ভাব্য ভেন্যু হিসেবে লিসবনের বাইরে সিন্ত্রা কিংবা রোনালদোর জন্মস্থান মাদেইরার নাম উঠে এসেছিল।
বিশেষ করে মাদেইরার রাজধানী ফুনশালের একটি গির্জায় রোনালদোর বিয়ে হবে—এমন খবর ছড়িয়ে পড়লে সেখানে ভক্ত ও কৌতূহলী মানুষের ভিড় জমে যায়। শত শত মানুষ গির্জার সামনে অপেক্ষা করলেও শেষ পর্যন্ত সেখানে রোনালদো-জর্জিনার বিয়ের কোনো অনুষ্ঠান হয়নি।
গির্জা কর্তৃপক্ষও আগে এএফপিকে জানিয়েছিল, রোনালদোর বিয়ের অনুষ্ঠান সেখানে নির্ধারিত নেই। তবে এমন আয়োজন করতে পারলে সেটি তাদের জন্য সম্মানের বিষয় হতো বলে জানিয়েছিল তারা।
শেষ পর্যন্ত লিসবন থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার পশ্চিমে আটলান্টিক উপকূলের শহর কাসকাইসকে বিয়ের স্থান হিসেবে বেছে নেন রোনালদো ও জর্জিনা। এই শহরে তাঁদের একটি ভিলাও রয়েছে।
‘প্রথম দেখাতেই প্রেম’
রোনালদো ও জর্জিনার সম্পর্কের শুরু ২০১৬ সালে। সে সময় স্পেনের মাদ্রিদে একটি বিলাসবহুল ফ্যাশন ব্র্যান্ডের শোরুমে বিক্রয়কর্মী হিসেবে কাজ করতেন জর্জিনা। সেখানেই তাঁদের প্রথম পরিচয়।
জর্জিনার নিজের ভাষ্য অনুযায়ী, রোনালদোর সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিল অনেকটা ‘প্রথম দেখাতেই প্রেম’-এর মতো। পরিচয়ের পর দ্রুতই তাঁদের মধ্যে ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয় এবং পরবর্তী সময়ে তাঁরা নিয়মিত একসঙ্গে জনসমক্ষে আসতে শুরু করেন।
২০১৭ সালের জানুয়ারিতে ফিফার ‘দ্য বেস্ট ফিফা ফুটবল অ্যাওয়ার্ডস’ অনুষ্ঠানে প্রথমবারের মতো দুজনকে একসঙ্গে জনসমক্ষে দেখা যায়। একই বছর মে মাসে জর্জিনার সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ্যে আনেন রোনালদো।
এরপর থেকে বিশ্বজুড়ে এই জুটি হয়ে ওঠে অন্যতম আলোচিত তারকা দম্পতি। ফুটবল, ফ্যাশন ও বিনোদন—বিভিন্ন অঙ্গনে তাঁদের উপস্থিতি নিয়মিতই সংবাদমাধ্যমের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে।

জর্জিনা এখন রোনালদোর স্ত্রী
৩২ বছর বয়সী জর্জিনা রদ্রিগেজের জন্ম আর্জেন্টিনার রাজধানী বুয়েনস এইরেসে। ফলে রোনালদোর সঙ্গে বিয়ের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁকে ঘিরে ‘আর্জেন্টিনার জামাই’ হিসেবে রসিকতাও শুরু হয়েছে।
২০২৫ সালে ভোগ অ্যারাবিয়াকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জর্জিনা তাঁদের সম্পর্ক নিয়ে নিজের অনুভূতি প্রকাশ করেছিলেন। রোনালদোর সঙ্গে পরিচয়ের পর তাঁর মনে হয়েছিল, তাঁরা যেন একে অপরকে বহু বছর ধরে চেনেন।
দীর্ঘ সম্পর্কের সময়ে দুজনকে বিভিন্ন দেশ ও আন্তর্জাতিক আয়োজনে একসঙ্গে দেখা গেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁদের অনুসারীর সংখ্যা ৭৫ কোটির বেশি বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁদের জনপ্রিয়তা শুধু ফুটবলকেন্দ্রিক নয়; ফ্যাশন, ব্যবসা, হোটেল ও বিভিন্ন ব্র্যান্ডভিত্তিক উদ্যোগেও তাঁদের সক্রিয়তা রয়েছে।
পাঁচ সন্তানকে ঘিরে পরিবার
রোনালদোর পারিবারিক জীবনও দীর্ঘদিন ধরে ভক্তদের আগ্রহের বিষয়। তাঁর বড় ছেলে ক্রিস্টিয়ানো জুনিয়রের জন্ম ২০১০ সালে। ছেলের মায়ের পরিচয় রোনালদো কখনো প্রকাশ্যে জানাননি।
২০১৭ সালের জুনে সারোগেসির মাধ্যমে যমজ সন্তান ইভা মারিয়া ও মাতেওর বাবা হন রোনালদো। একই বছরের শেষ দিকে জর্জিনার কোলে আসে তাঁদের কন্যা অ্যালানা মার্টিনা।
২০২২ সালে জর্জিনার গর্ভে যমজ সন্তান জন্ম নেয়। তবে জন্মের কিছুক্ষণ পর তাঁদের ছেলে অ্যাঞ্জেল মারা যায়। তাঁদের মেয়ে বেলা জীবিত থাকে।
বিয়ের অনুষ্ঠানে এই পরিবারের পাঁচ সন্তান উপস্থিত ছিল বলে রোনালদোর প্রতিনিধিরা জানিয়েছেন। দীর্ঘ সম্পর্কের পর বিয়ের দিনটি তাই তাঁদের জন্য শুধু দম্পতি হিসেবে নতুন যাত্রার নয়, পরিবারেরও একটি বিশেষ মুহূর্ত হয়ে উঠেছে।
মাঠেও রোনালদোর রেকর্ডের রাজত্ব
ব্যক্তিজীবনে নতুন অধ্যায় শুরু হলেও পেশাদার ফুটবলে রোনালদোর সাফল্যের তালিকা আরও দীর্ঘ। ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড, রিয়াল মাদ্রিদ ও জুভেন্টাসের মতো ইউরোপের শীর্ষ ক্লাবে খেলার পর বর্তমানে সৌদি প্রো লিগের ক্লাব আল নাসরের হয়ে মাঠ মাতাচ্ছেন তিনি।
ক্যারিয়ারে রোনালদো পাঁচবার ব্যালন ডি’অর জিতেছেন। পাঁচবার চ্যাম্পিয়নস লিগ শিরোপা জয়ের পাশাপাশি ইংল্যান্ড, স্পেন ও ইতালির ঘরোয়া লিগেও শিরোপা জয়ের স্বাদ পেয়েছেন।
পর্তুগাল জাতীয় দলের হয়েও তিনি একাধিক রেকর্ডের মালিক। দেশের হয়ে সবচেয়ে বেশি ম্যাচ খেলা এবং সর্বোচ্চ গোল করার রেকর্ড তাঁর দখলে। ক্যারিয়ারের ৯৭৬ গোলের মাইলফলকও তাঁকে ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা গোলদাতার আসনে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
ফুটবল মাঠে অসংখ্য অর্জনের পর এবার ব্যক্তিজীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়গুলোর একটি সম্পন্ন করলেন রোনালদো। দীর্ঘদিনের সঙ্গী জর্জিনাকে বিয়ে করে পর্তুগিজ এই তারকা এখন একই সঙ্গে ফুটবল বিশ্বের কিংবদন্তি এবং আর্জেন্টিনার ‘জামাই’ হিসেবেও আলোচনায়।



