প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে ভারতীয় হাইকমিশনারের সাক্ষাৎ, শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ নিয়ে আলোচনা

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে ভারতীয় হাইকমিশনারের সাক্ষাৎ, শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ নিয়ে আলোচনা
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের : বাংলাদেশ সচিবালয়ে আজ সোমবার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী / ছবি: পিএমও

বাংলাদেশ ও ভারতের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছেন ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী। বৈঠকে দুই দেশের সম্পর্ক, পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় এবং সাম্প্রতিক বিভিন্ন ইস্যু নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

সাক্ষাতে বাংলাদেশ ভারতের কাছে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণের প্রক্রিয়া দ্রুত এগিয়ে নেওয়ার প্রত্যাশা পুনর্ব্যক্ত করেছে। একই সঙ্গে শহীদ ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় জড়িত বলে বাংলাদেশের তদন্তে চিহ্নিত ব্যক্তিদের দেশে ফিরিয়ে দেওয়ার বিষয়েও ভারতের সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ভারতীয় হাইকমিশনারের বৈঠক

সোমবার বাংলাদেশ সচিবালয়ের মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে এই সৌজন্য সাক্ষাৎ অনুষ্ঠিত হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর উপ-প্রেস সচিব শাহাদাৎ স্বাধীন সাক্ষাতের বিষয়টি সাংবাদিকদের জানান।

বৈঠকের শুরুতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীকে স্বাগত জানান। এ সময় হাইকমিশনার ঢাকায় দায়িত্ব পালনের সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতা ও দুই দেশের সম্পর্ক নিয়ে তাঁর পর্যবেক্ষণ প্রধানমন্ত্রীর কাছে তুলে ধরেন।

দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে পারস্পরিক যোগাযোগ ও আলোচনার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে বলেও সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাত দিয়ে জানানো হয়েছে।

ভারতের নতুন হাইকমিশনার হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে এটি দীনেশ ত্রিবেদীর প্রথম সৌজন্য সাক্ষাৎ বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণ নিয়ে বাংলাদেশের প্রত্যাশা

বৈঠকে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ভারতে অবস্থানরত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণের বিষয়টি গুরুত্ব পায়। বাংলাদেশ আশা করছে, শেখ হাসিনাকে দেশে ফেরানোর জন্য চলমান প্রত্যর্পণ-প্রক্রিয়া দ্রুত এগিয়ে নিতে ভারত প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করবে।

শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের বিষয়টি এর আগে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকেও বিভিন্ন সময়ে উত্থাপন করা হয়েছে। সরকারের বক্তব্য অনুযায়ী, তাঁকে দেশে ফিরিয়ে এনে সংশ্লিষ্ট মামলাগুলোতে আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি করার উদ্যোগ রয়েছে।

তবে প্রত্যর্পণের বিষয়টি দুই দেশের বিদ্যমান আইন, চুক্তি ও কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত। ফলে এ বিষয়ে চূড়ান্ত অগ্রগতি নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট দুই দেশের আইনি ও কূটনৈতিক পদক্ষেপের ওপর।

ওসমান হাদি হত্যা মামলায় সহযোগিতা চাওয়া

বৈঠকে শহীদ ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বাংলাদেশে ফিরিয়ে দেওয়ার বিষয়েও ভারতের প্রতি অনুরোধ জানানো হয়।

বাংলাদেশের পক্ষ থেকে দীর্ঘদিন ধরেই বিভিন্ন অপরাধে অভিযুক্ত বা মামলায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অবস্থান শনাক্ত ও প্রয়োজন অনুযায়ী ফেরত আনার ক্ষেত্রে প্রতিবেশী দেশগুলোর সহযোগিতা চাওয়া হচ্ছে। ওসমান হাদি হত্যা মামলাও বর্তমানে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের আলোচনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে।

ভারতে অবস্থানরত কোনো ব্যক্তিকে বাংলাদেশে ফেরানোর ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট দেশের আইন, আদালতের প্রক্রিয়া এবং দুই দেশের পারস্পরিক সহযোগিতার কাঠামো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

দুই দেশের সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা

বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক দীর্ঘদিনের এবং বহুমাত্রিক। বাণিজ্য, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, যোগাযোগ, জ্বালানি, পানি, নিরাপত্তা, ভিসা এবং আঞ্চলিক সহযোগিতাসহ বিভিন্ন বিষয়ে দুই দেশের পারস্পরিক স্বার্থ রয়েছে।

সাম্প্রতিক সময়ে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ককে নতুন বাস্তবতার মধ্য দিয়ে এগিয়ে নেওয়ার প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি আলোচনায় এসেছে।

গত ২৯ জুলাই ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান ও পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন। ওই সময় তিনি বলেন, বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে এমন কোনো সমস্যা নেই, যা পারস্পরিক বোঝাপড়ার মাধ্যমে সমাধান করা যায় না। একই সঙ্গে তিনি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে ভারত সফরে স্বাগত জানানোর আগ্রহের কথাও জানিয়েছিলেন।

এর আগে ২৫ জুন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের কাছে পরিচয়পত্র পেশের মাধ্যমে ঢাকায় ভারতের হাইকমিশনার হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব শুরু করেন দীনেশ ত্রিবেদী। তাঁকে বাংলাদেশে ভারতের ১৬তম হাইকমিশনার হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

দীনেশ ত্রিবেদীর দায়িত্ব গ্রহণ

দীনেশ ত্রিবেদী পেশাদার কূটনীতিক নন; তিনি ভারতের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন সক্রিয় ছিলেন এবং সাবেক কেন্দ্রীয় মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০২৬ সালের এপ্রিল মাসে তাঁকে বাংলাদেশে ভারতের নতুন হাইকমিশনার হিসেবে নিয়োগের সিদ্ধান্ত জানানো হয়। তিনি প্রণয় ভার্মার স্থলাভিষিক্ত হন।

২৫ জুন বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতির কাছে পরিচয়পত্র পেশের পর তাঁর আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক দায়িত্ব শুরু হয়। দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তাঁর বক্তব্য ও তৎপরতা নজরে এসেছে।

এর আগে ঢাকায় দায়িত্ব নেওয়ার প্রস্তুতিকালেও বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক নিয়ে তাঁর বিভিন্ন পর্যায়ের যোগাযোগ ছিল। মে মাসে ভারতের সেনাপ্রধান জেনারেল উপেন্দ্র দ্বিবেদীর সঙ্গে তাঁর বৈঠকে বাংলাদেশ-ভারতের সামরিক সহযোগিতা ও সীমান্ত নিরাপত্তার মতো বিষয় আলোচনায় এসেছিল বলে ভারতীয় সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল।

পারস্পরিক সম্মানের ওপর জোর বাংলাদেশের

বাংলাদেশ সরকারের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তার বক্তব্য অনুযায়ী, দুই দেশের সম্পর্ককে ইতিবাচক পথে এগিয়ে নিতে আলোচনার কোনো বিকল্প নেই। পারস্পরিক সম্মান, মর্যাদা ও স্বার্থকে গুরুত্ব দিয়ে সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।

ওই কর্মকর্তা বলেন, দুই দেশকেই পরস্পরের সংবেদনশীল বিষয়গুলোর প্রতি যথেষ্ট শ্রদ্ধাশীল হতে হবে। আলোচনার মাধ্যমে বিভিন্ন মতপার্থক্য ও জটিলতা সমাধানের পথ খুঁজে বের করাই সম্পর্ক উন্নয়নের কার্যকর উপায়।

কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, প্রতিবেশী দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক যোগাযোগের পাশাপাশি বাস্তব স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোও গুরুত্বপূর্ণ। সীমান্ত, বাণিজ্য, পানি, যোগাযোগ, নিরাপত্তা ও জনগণের চলাচলের মতো বিষয়গুলোতে কার্যকর সহযোগিতা থাকলে সামগ্রিক দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কও স্থিতিশীল রাখা সহজ হয়।

সামনে যেসব বিষয় গুরুত্বপূর্ণ

ঢাকা ও দিল্লির সম্পর্কের ক্ষেত্রে সামনে কয়েকটি বিষয় বিশেষ গুরুত্ব পেতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ, ওসমান হাদি হত্যা মামলায় অভিযুক্তদের ফেরত আনা, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, ভিসা ও জনগণের চলাচল, বাণিজ্য এবং আঞ্চলিক সহযোগিতা।

এর পাশাপাশি দুই দেশের রাজনৈতিক নেতৃত্বের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগও সম্পর্কের ভবিষ্যৎ গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

ভারতীয় হাইকমিশনার ইতিমধ্যে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে ভারত সফরের আমন্ত্রণের বিষয়ে ইতিবাচক বার্তা দিয়েছেন। ফলে ভবিষ্যতে দুই দেশের শীর্ষ পর্যায়ে বৈঠক হলে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো আরও বিস্তৃতভাবে আলোচনায় আসতে পারে।

সম্পর্ক উন্নয়নে আলোচনাই প্রধান পথ

বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে নানা বিষয়ে মতপার্থক্য থাকলেও দুই দেশের ভৌগোলিক নৈকট্য ও পারস্পরিক স্বার্থের কারণে সম্পর্ককে কার্যকর রাখার গুরুত্ব রয়েছে। তাই আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা সমাধান এবং একে অপরের উদ্বেগকে গুরুত্ব দেওয়ার ওপরই জোর দিচ্ছে উভয় পক্ষ।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর সৌজন্য সাক্ষাৎ সেই ধারাবাহিক কূটনৈতিক যোগাযোগের অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ ও ওসমান হাদি হত্যা মামলায় অভিযুক্তদের ফেরত আনার মতো সংবেদনশীল বিষয়গুলোতে ভারতের অবস্থান ও পরবর্তী পদক্ষেপ এখন ঢাকার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

দুই দেশের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা ও সহযোগিতা বাড়াতে নিয়মিত রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক যোগাযোগ অব্যাহত রাখাই আগামী দিনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ।


প্রধান সোর্স

  1. বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (BSS) — প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ভারতীয় হাইকমিশনারের সৌজন্য সাক্ষাৎ
    প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর ১০ আগস্ট ২০২৬-এর সাক্ষাৎ এবং আলোচনার বিষয়গুলো।
    BSS: প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ভারতীয় হাইকমিশনারের সৌজন্য সাক্ষাৎ
  2. প্রথম আলো — বাংলাদেশ আশা করে, ভারত শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণের প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করবে
    সাক্ষাতের বিস্তারিত, শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ এবং ওসমান হাদি হত্যা মামলায় জড়িতদের ফেরত চাওয়ার বিষয়।
    প্রথম আলো: বাংলাদেশ আশা করে, ভারত শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণের প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করবে
  3. সারাবাংলা — দণ্ডপ্রাপ্ত শেখ হাসিনাসহ সন্দেহভাজন খুনিদের দ্রুত প্রত্যর্পণের আহ্বান
    পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ব্রিফিং এবং প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ভারতীয় হাইকমিশনারের সাক্ষাতের পর বাংলাদেশের অবস্থান।
    সারাবাংলা: পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ব্রিফিং

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top