ফ্যাসিবাদমুক্ত বাংলাদেশে ঘুরে দাঁড়ানোর পালা: প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান
রাজস্ব ব্যবস্থায় জনআস্থা, করদাতাবান্ধব প্রশাসন ও ডিজিটালাইজেশনের ওপর গুরুত্ব; চা-শ্রমিকদের জন্য ২০ হাজার রেইনকোট বিতরণ কর্মসূচির উদ্বোধন

ফ্যাসিবাদমুক্ত বাংলাদেশে অর্থনীতি ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে নতুনভাবে গড়ে তুলতে সবাইকে একযোগে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, দেশের স্বার্থকে ব্যক্তি বা গোষ্ঠীস্বার্থের ঊর্ধ্বে রেখে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) জনগণের কাছে আরও নির্ভরযোগ্য, দক্ষ ও আস্থাভাজন প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে হবে।
মঙ্গলবার সকালে রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে আয়োজিত রাজস্ব সম্মেলনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। অর্থ মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ড যৌথভাবে এ সম্মেলনের আয়োজন করে।
রাজস্ব ব্যবস্থায় জনআস্থা বাড়ানোর আহ্বান
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ভঙ্গুর অর্থনীতির মধ্যে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নেওয়ার পর সরকারের উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়নের সাফল্য অনেকাংশেই এনবিআরের কার্যক্রমের ওপর নির্ভরশীল। সরকার অপ্রয়োজনীয় খাতে ব্যয় কমানোর চেষ্টা করছে; তবে প্রয়োজনীয় খাতে ব্যয় অব্যাহত থাকবে।
তিনি বলেন, এনবিআরকে এমন একটি প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে হবে, যেখানে করদাতারা ভয় নয়, আস্থা ও বিশ্বাস নিয়ে আসবেন। কর ব্যবস্থাপনা সহজ, স্বচ্ছ, দুর্নীতিমুক্ত ও হয়রানিমুক্ত হলে জনগণের স্বতঃস্ফূর্তভাবে কর প্রদানের প্রবণতা বাড়বে।
তারেক রহমান বলেন, দীর্ঘদিনের শাসন-শোষণের কারণে অন্যান্য রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের মতো এনবিআরও নানা সংকটে পড়েছিল। নীতি ও নিয়ম উপেক্ষা করে ব্যক্তি বা দলীয় স্বার্থে পৃষ্ঠপোষকতা, বৈষম্যমূলক আচরণ এবং রাজস্ব আহরণে স্বেচ্ছাচারিতার কারণে প্রতিষ্ঠানটির প্রতি মানুষের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
“ফ্যাসিবাদমুক্ত দেশে এখন আমাদের ঘুরে দাঁড়ানোর পালা”—এমন মন্তব্য করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের স্বার্থে এনবিআরকে নতুনভাবে গড়ে তোলার দায়িত্ব রাজস্ব কর্মকর্তাদের নিতে হবে।
আধুনিক কর ব্যবস্থায় প্রযুক্তিগত দক্ষতার ওপর গুরুত্ব
বিশ্ব অর্থনীতির দ্রুত পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে রাজস্ব কর্মকর্তাদের বহুমাত্রিক দক্ষতা অর্জনের ওপর গুরুত্ব দেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ডিজিটাল অর্থনীতি, ই-কমার্স, ট্রান্সফার প্রাইসিং, আন্তর্জাতিক করব্যবস্থা, ট্রেড-ফাইন্যান্সিয়াল ক্রাইম, মানি লন্ডারিং ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসহ আধুনিক অর্থনীতির বিভিন্ন বিষয়ে কর্মকর্তাদের সুস্পষ্ট জ্ঞান থাকা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, বর্তমানে দেশের কর-জিডিপি অনুপাত অর্থনীতির সক্ষমতার তুলনায় কম। অর্থনীতির একটি বড় অংশ এখনো কর ব্যবস্থার আওতার বাইরে রয়েছে। ফলে নিয়মিত করদাতাদের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে নতুন করদাতা শনাক্ত করে তাদের যথাযথভাবে করের আওতায় আনতে হবে।
এ জন্য প্রধানমন্ত্রী একটি আধুনিক, ডিজিটাল ও ডাটাভিত্তিক কর প্রশাসন গড়ে তোলার ওপর জোর দেন।
শুধু বেশি কর নয়, স্বেচ্ছায় কর প্রদানের পরিবেশ
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আধুনিক কর প্রশাসনের লক্ষ্য শুধু বেশি রাজস্ব আদায় করা নয়; বরং অধিকসংখ্যক মানুষকে স্বেচ্ছায় কর প্রদানে উৎসাহিত করা।
তার মতে, করদাতাদের সঙ্গে রাজস্ব প্রশাসনের আস্থার সম্পর্ক শক্তিশালী করতে হবে। একই করদাতার ওপর বারবার করের বোঝা বাড়িয়ে রাজস্ব বাড়ানোর নীতি দীর্ঘমেয়াদে টেকসই নয়। বরং কর প্রদানের সক্ষমতা রয়েছে এমন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে শনাক্ত করে নিয়মতান্ত্রিকভাবে করের আওতায় আনতে হবে।
ভ্যাট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আধুনিক অর্থনীতিতে ভ্যাট গুরুত্বপূর্ণ রাজস্ব উৎস। তবে ভ্যাট ব্যবস্থাপনার জটিলতার কারণে যেন ব্যবসা-বাণিজ্য বাধাগ্রস্ত না হয়, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, কাস্টমস, ভ্যাট বা আয়কর আদায় শুধু কঠোরতার বিষয় নয়। দক্ষ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে করদাতাদের মধ্যে আস্থা তৈরি করা গেলে রাজস্ব আহরণ আরও সহজ হবে।
সবাইকে নিয়ে নতুন বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়
রাজস্ব কর্মকর্তাদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ব্যক্তি স্বার্থের চেয়ে প্রতিষ্ঠান এবং সর্বোপরি দেশের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। সরকারের লক্ষ্য সবাইকে সঙ্গে নিয়ে নতুন বাংলাদেশ গড়ে তোলা।
তিনি বলেন, দেশের বিভিন্ন সমস্যা আলোচনার মাধ্যমে ধীরে ধীরে সমাধানের চেষ্টা করা হবে। সরকারের কর্মকর্তাদের নিরাপদ ও স্বস্তির পরিবেশে দেশ গঠনের কাজে এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, দেশের স্বার্থে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোকে সরকার অগ্রাধিকার দেবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি থেকে জুনের শেষ পর্যন্ত রাজস্ব আহরণের ক্ষেত্রে ইতিবাচক প্রবণতা দেখা গেছে। এতে প্রমাণ হয়েছে যে রাজস্ব কর্মকর্তারা সক্ষম। দেশপ্রেম ও আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করলে একটি শক্তিশালী রাজস্ব ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব।
রাজস্ব সম্মেলনের শুরুতে জাতীয় সংগীত পরিবেশন করা হয়। পরে রাজস্ব আদায় নিয়ে মুক্ত আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। সম্মেলনে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এবং প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বক্তব্য দেন।
অনুষ্ঠান শেষে প্রধানমন্ত্রী এনবিআরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে ফটোসেশনে অংশ নেন এবং এনবিআরের বিভিন্ন স্টলে স্থাপিত ডিজিটাল স্ক্রিনে উপস্থাপিত কার্যক্রম পরিদর্শন করেন।
চা-শ্রমিকদের জন্য ২০ হাজার রেইনকোট
এর আগে সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে সিলেট বিভাগের চা-বাগান শ্রমিকদের প্রতিকূল আবহাওয়া থেকে সুরক্ষার লক্ষ্যে ২০ হাজার রেইনকোট বিতরণ কর্মসূচির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
বেসরকারি খাতের করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা (সিএসআর) তহবিলের সহায়তায় সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে এ কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে শ্রীমঙ্গল ও কমলগঞ্জের ১০ জন চা-শ্রমিকের হাতে রেইনকোট তুলে দেন প্রধানমন্ত্রী। এ সময় তিনি শ্রমিকদের সার্বিক খোঁজখবর নেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, সমাজের সবাই নিজ নিজ জায়গা থেকে সামান্য করে এগিয়ে এলে বড় সমস্যারও সমাধান করা সম্ভব। জনকল্যাণমূলক ও মানবিক উদ্যোগে বেসরকারি খাতকে সরকারের পক্ষ থেকে সর্বাত্মক সহযোগিতার আশ্বাস দিয়ে তিনি বলেন, যারা এ ধরনের কাজে অংশ নিতে চান, সরকার তাদের পাশে থাকবে।
যেভাবে বিতরণ হবে ২০ হাজার রেইনকোট
সিলেট, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ জেলার বিভিন্ন চা-বাগানে কর্মরত শ্রমিকদের মধ্যে মোট ২০ হাজার রেইনকোট বিতরণ করা হবে।
এর মধ্যে বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ফার্মাসিউটিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ (বাপি) ১০ হাজার, শেভরন বাংলাদেশ ৫ হাজার এবং পা-ুঘর গ্রুপ ৫ হাজার রেইনকোট সরবরাহ করছে।
বেসরকারি খাতের প্রতিনিধিরা বলেন, ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি শ্রমজীবী ও পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর কল্যাণে কাজ করা করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সরকারের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে ভবিষ্যতেও চা-শ্রমিকসহ বিভিন্ন প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবনমান ও নিরাপদ কর্মপরিবেশ উন্নয়নে কাজ করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তারা।
রেইনকোট গ্রহণের সময় শ্রীমঙ্গলের মাজদিহি চা-বাগানের শ্রমিক সন্তুকী রায় চা-শ্রমিকদের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রীকে শুভেচ্ছা হিসেবে চা-পাতা উপহার দেন।
অনুষ্ঠানে চা-শ্রমিকদের পক্ষে শান্তি উড়িয়া, মুন্নী কুর্মি, জ্যোৎস্না আক্তার, রিনা তাঁতী, শশিকা ব্যানার্জি, কবিতা কর্মকার, সুজাতা বিশ্বাস, রিতা রাণী বাউরী ও আফখাতুন নাহার উপস্থিত ছিলেন।
অনুষ্ঠানে সমাজকল্যাণ এবং মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রী অধ্যাপক ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন, বাণিজ্য, শিল্প এবং বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির, শ্রম ও কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী এবং সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমীন উপস্থিত ছিলেন।
এ ছাড়া সংসদ সদস্য এমরান আহমদ চৌধুরী (সিলেট-৬), নাসির উদ্দিন মিঠু (মৌলভীবাজার-১), মো. শওকতুল ইসলাম (মৌলভীবাজার-২), এম নাসের রহমান (মৌলভীবাজার-৩), হাজী মুজিবুর রহমান চৌধুরী (মৌলভীবাজার-৪), আলহাজ মো. জি কে গউছ (হবিগঞ্জ-৩) এবং এস এম ফয়সাল (হবিগঞ্জ-৪) উপস্থিত ছিলেন।
বেসরকারি খাতের প্রতিনিধিদের মধ্যে বাপির সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট মোসাদ্দেক হোসেন, উপদেষ্টা তপন চৌধুরী, কার্যকরী সদস্য মিজ সিমিন রহমান, নির্বাহী পরিচালক মো. সাইফুল ইসলাম, শেভরন বাংলাদেশের পরিচালক মো. ইমরুল কবির, আশিক শেহজাদ রহমান ও হেড অব কমিউনিটি এনগেজমেন্ট একেএম আরিফ আখতার এবং পা-ুঘর গ্রুপের পিপল অ্যান্ড করপোরেট অ্যাফেয়ার্স চিফ গোলাম হাবিব অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।



