হুমায়ুন কবির ব্রিটিশ নাগরিকত্ব: হুমায়ুন কবির কি ব্রিটিশ নাগরিকত্ব ত্যাগ করেছেন? যে প্রশ্নে বিতর্ক

হুমায়ুন কবির ব্রিটিশ নাগরিকত্ব: হুমায়ুন কবির কি ব্রিটিশ নাগরিকত্ব ত্যাগ করেছেন? যে প্রশ্নে বিতর্ক
হুমায়ুন কবির ব্রিটিশ নাগরিকত্ব: পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী (টেকনোক্র্যাট) হিসেবে গত শুক্রবার শপথ নেওয়ার পর হুমায়ুন কবিরের ব্রিটিশ নাগরিকত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। দীর্ঘদিন যুক্তরাজ্যে বসবাস করা এবং দেশটির নাগরিকত্ব নেওয়া হুমায়ুন কবির বর্তমানে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্বে রয়েছেন। তবে এই দায়িত্ব গ্রহণের আগে তিনি ব্রিটিশ নাগরিকত্ব ত্যাগ করেছেন কি না, সে বিষয়ে এখনো স্পষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সূত্র, যুক্তরাজ্য বিএনপির নেতাদের বক্তব্য এবং সংশ্লিষ্ট আইনজীবীর মতামত থেকে বিষয়টি নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে। সরকারের বিভিন্ন সূত্রও জানিয়েছে, হুমায়ুন কবির বিদেশি নাগরিকত্ব ত্যাগের আবেদন করেছেন—এমন কোনো তথ্য তাদের কাছে নেই। অন্যদিকে, যুক্তরাজ্য বিএনপির একাধিক নেতা তাঁর ব্রিটিশ নাগরিকত্ব থাকার বিষয়টি নিশ্চিত করলেও তিনি নাগরিকত্ব ত্যাগ করেছেন কি না, তা নিশ্চিত করতে পারেননি।

ব্রিটিশ নাগরিকত্ব ত্যাগ করেছেন কি না, স্পষ্ট নয়

সিলেটের ওসমানীনগর উপজেলার হবসপুরে জন্ম হুমায়ুন কবিরের। মাত্র আড়াই বছর বয়সে পরিবারের সঙ্গে তিনি যুক্তরাজ্যে চলে যান। সেখানেই তাঁর বেড়ে ওঠা, উচ্চশিক্ষা ও কর্মজীবনের বড় অংশ কাটে। পরবর্তী সময়ে তিনি যুক্তরাজ্যের নাগরিকত্ব গ্রহণ করেন এবং দেশটির লেবার পার্টির রাজনীতির সঙ্গেও যুক্ত হন।

বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সূত্র জানিয়েছে, চলতি বছরের ১৭ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র উপদেষ্টার দায়িত্ব নেওয়ার পর ২৩ ফেব্রুয়ারি হুমায়ুন কবির তাঁর সাধারণ বা সবুজ পাসপোর্ট জমা দেন। একই মাসে তিনি সরকারি বা কূটনৈতিক পাসপোর্ট গ্রহণ করেন। ওই পাসপোর্ট ব্যবহার করেই তিনি সৌদি আরব সফর করেন।

গত ছয় মাসে সরকারি পাসপোর্টে তিনি যুক্তরাষ্ট্র, চীন, রাশিয়া, তুরস্ক, ভারত, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, মরিশাস ও ফিলিপাইনসহ বিভিন্ন দেশে অন্তত ১১টি বিদেশ সফর করেছেন বলে মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে।

তবে সরকারি পাসপোর্ট গ্রহণের সঙ্গে বিদেশি নাগরিকত্ব ত্যাগের বিষয়টি সরাসরি এক নয়। হুমায়ুন কবির ব্রিটিশ নাগরিকত্ব আনুষ্ঠানিকভাবে ত্যাগ করেছেন কি না, সেটিই এখন মূল প্রশ্ন।

সরকারি সূত্রে নাগরিকত্ব ত্যাগের তথ্য নেই

হুমায়ুন কবিরের ব্রিটিশ নাগরিকত্ব ত্যাগের বিষয়ে সরকারের সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর কাছেও পরিষ্কার তথ্য নেই। সূত্রগুলো বলছে, তিনি নাগরিকত্ব ত্যাগের আবেদন করেছেন—এমন কোনো চিঠি বা নথির তথ্য তাদের কাছে পাওয়া যায়নি।

বিষয়টি নিয়ে বক্তব্য জানতে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবিরের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। শনিবার তাঁকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তাঁর সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়নি। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ দপ্তরের সঙ্গেও যোগাযোগ করা হয়। তবে এ বিষয়ে তাদের কাছ থেকেও কোনো জবাব পাওয়া যায়নি।

ফলে তিনি বর্তমানে ব্রিটিশ নাগরিক কি না, অথবা দায়িত্ব নেওয়ার আগে ব্রিটিশ নাগরিকত্ব ত্যাগের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছেন কি না—এ বিষয়ে এখনো তাঁর পক্ষ থেকে কোনো স্পষ্ট বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

বাংলাদেশের সংবিধানে কী বলা আছে?

হুমায়ুন কবিরের বিদেশি নাগরিকত্ব নিয়ে প্রশ্নের কেন্দ্রে রয়েছে বাংলাদেশের সংবিধানের সংশ্লিষ্ট বিধান। সংবিধানের ৫৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী ও অন্যান্য মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রীকে রাষ্ট্রপতি নিয়োগ দেন। একই সঙ্গে সংসদ সদস্য নন—এমন ব্যক্তিদের মধ্য থেকেও নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী বা উপমন্ত্রী নিয়োগের সুযোগ রয়েছে। তবে তাঁদের সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার যোগ্য হতে হবে।

সংবিধানের ৬৬ অনুচ্ছেদের ২(গ) অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি সংসদের সদস্য নির্বাচিত হওয়ার এবং সংসদ সদস্য থাকার যোগ্য হবেন না, যদি তিনি কোনো বিদেশি রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব অর্জন করেন অথবা কোনো বিদেশি রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য ঘোষণা বা স্বীকার করেন।

এই সাংবিধানিক বিধানের কারণেই হুমায়ুন কবিরের ব্রিটিশ নাগরিকত্বের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তিনি যদি ব্রিটিশ নাগরিকত্ব ত্যাগ করে থাকেন, তাহলে সেই ত্যাগের আনুষ্ঠানিক প্রমাণ বা প্রক্রিয়া কীভাবে সম্পন্ন হয়েছে—তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।

শুধু নাগরিকত্ব ত্যাগের আবেদন করলেই কি তা কার্যকর হয়?

সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী শরীফ ভূঁইয়া মনে করেন, বিদেশি নাগরিকত্ব ত্যাগের বিষয়টি সংশ্লিষ্ট দেশের আইনের অধীনেই নিষ্পত্তি হয়। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি নাগরিকত্ব ত্যাগের আবেদন করলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে নাগরিকত্ব ত্যাগ হয়ে যায় না। সংশ্লিষ্ট দেশ আবেদন যাচাই-বাছাই করে সিদ্ধান্ত দেওয়ার পর বিষয়টি কার্যকর হয়।

শরীফ ভূঁইয়া বলেন, হুমায়ুন কবির বিদেশি নাগরিকত্ব ত্যাগ করেছেন কি না কিংবা ত্যাগের জন্য আবেদন করেছেন কি না, সেটিই এখন পরিষ্কার নয়। এ বিষয়ে যথেষ্ট তথ্য প্রকাশ্যে না থাকায় তাঁর প্রতিমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগের সাংবিধানিক বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায় বলেও তিনি মত দেন।

তবে হুমায়ুন কবিরের ক্ষেত্রে চূড়ান্তভাবে তিনি ব্রিটিশ নাগরিকত্ব ত্যাগ করেছেন কি না, তা নির্ধারণের জন্য সংশ্লিষ্ট নথি ও যুক্তরাজ্যের নাগরিকত্ব আইনের আওতায় প্রক্রিয়াটি যাচাই করা প্রয়োজন।

বিদেশি নাগরিকত্ব ত্যাগের আগের নজির

বাংলাদেশের রাজনীতিতে নির্বাচনের আগে বিদেশি নাগরিকত্ব ত্যাগের বিষয়টি নতুন নয়। সর্বশেষ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগেও কয়েকজন প্রার্থী বিদেশি নাগরিকত্ব ত্যাগ করে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার প্রস্তুতি নিয়েছিলেন।

গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে বর্তমান পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব ত্যাগ করেন। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদও যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব ত্যাগ করেন বলে সংশ্লিষ্ট সময়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে তথ্য প্রকাশিত হয়।

সেই নির্বাচনের আগে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের অন্তত ২৩ জন প্রার্থী বিদেশি নাগরিকত্ব ত্যাগের আবেদন করে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন বলে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। যেসব প্রার্থী বিদেশি নাগরিকত্ব ত্যাগের আবেদনের প্রমাণ দেখাতে পেরেছিলেন, তাঁদের মনোনয়নপত্র নির্বাচন কমিশন বৈধ ঘোষণা করে।

এর আগেও বিদেশি নাগরিকত্ব নিয়ে নির্বাচনী বিতর্ক তৈরি হয়েছে। ২০২৪ সালের দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অস্ট্রেলিয়ার নাগরিকত্ব থাকার কারণে বরিশাল-৪ আসনে আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থী শাম্মী আহমেদের মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছিল। একই নির্বাচনে ফরিদপুর-৩ আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী শামীম হকের নেদারল্যান্ডসের নাগরিকত্ব নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। তিনি নাগরিকত্ব ত্যাগের পক্ষে নির্বাচন কমিশনে নথি জমা দিয়েছিলেন। তবে ওই নথি নিয়ে পরবর্তী সময়ে অভিযোগ ওঠে।

যুক্তরাজ্যে হুমায়ুন কবিরের রাজনৈতিক জীবন

হুমায়ুন কবিরের রাজনৈতিক পরিচয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় যুক্তরাজ্যের লেবার পার্টির রাজনীতি। দীর্ঘ সময় যুক্তরাজ্যে বসবাসের কারণে সেখানকার রাজনৈতিক পরিসরে তাঁর সক্রিয়তা ছিল।

টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিলের সাবেক ডেপুটি মেয়র অহিদ আহমদ চৌধুরীর ভাষ্য অনুযায়ী, ২০০৬ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত হুমায়ুন কবির লেবার পার্টির বেথনাল গ্রিন অ্যান্ড বো শাখার সেক্রেটারি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

শিক্ষাজীবনেও তাঁর যুক্তরাজ্যভিত্তিক দীর্ঘ অভিজ্ঞতা রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, তিনি ইউনিভার্সিটি অব সাসেক্স থেকে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। পরে লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকস অ্যান্ড পলিটিক্যাল সায়েন্স, ইউনিভার্সিটি অব কেমব্রিজ এবং লিডস ল স্কুল থেকে পৃথক বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নেন।

পেশাগত জীবনেও তিনি যুক্তরাজ্যের সরকারি কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। লন্ডনের মেয়রের দপ্তরসহ ব্রিটিশ সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা রয়েছে তাঁর।

বিএনপির আন্তর্জাতিক রাজনীতি থেকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে

যুক্তরাজ্যের রাজনীতিতে দীর্ঘ সম্পৃক্ততার পর হুমায়ুন কবির বাংলাদেশের রাজনীতিতেও সক্রিয় হন। ২০২৫ সালের ২২ অক্টোবর তিনি বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব (আন্তর্জাতিক বিষয়ক) পদে দায়িত্ব পান।

এরপর চলতি বছরের ১৭ ফেব্রুয়ারি তিনি প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব নেন। পরবর্তীতে গত শুক্রবার পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী (টেকনোক্র্যাট) হিসেবে শপথ নেন তিনি।

দীর্ঘদিন বিদেশে বসবাস, ব্রিটিশ নাগরিকত্ব এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে তাঁর অভিজ্ঞতার কারণে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর তাঁর নাগরিকত্বের বিষয়টি স্বাভাবিকভাবেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

এখন যে প্রশ্নের উত্তর প্রয়োজন

হুমায়ুন কবির ব্রিটিশ নাগরিকত্ব ত্যাগ করেছেন কি না—এই প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর এখনো প্রকাশ্যে আসেনি। সরকারি সূত্রে তাঁর নাগরিকত্ব ত্যাগের আবেদনের তথ্য না থাকা, যুক্তরাজ্য বিএনপির নেতাদের বিষয়টি নিশ্চিত করতে না পারা এবং প্রতিমন্ত্রীর পক্ষ থেকে কোনো বক্তব্য না পাওয়ায় বিষয়টি অনিষ্পন্ন রয়েছে।

এ ক্ষেত্রে নাগরিকত্ব ত্যাগের আবেদন করা হয়েছে কি না এবং আবেদন করা হয়ে থাকলে যুক্তরাজ্যের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তা অনুমোদন করেছে কি না—দুই বিষয়ই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ শুধু আবেদন করাই নাগরিকত্ব ত্যাগের চূড়ান্ত প্রমাণ নয়।

ফলে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হিসেবে হুমায়ুন কবিরের সাংবিধানিক যোগ্যতা নিয়ে তৈরি হওয়া প্রশ্নের পরিষ্কার উত্তর পেতে তাঁর নাগরিকত্বের বর্তমান অবস্থা এবং নাগরিকত্ব ত্যাগের কোনো আনুষ্ঠানিক নথি প্রকাশ বা যাচাই হওয়া প্রয়োজন। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বা হুমায়ুন কবির নিজে এ বিষয়ে অবস্থান স্পষ্ট করলে বিতর্কটিরও অবসান হতে পারে।


Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top