জনগণকে বিভ্রান্তকারীদের বিষয়ে সতর্ক থাকার আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর

ফ্যামিলি কার্ড: জনগণকে বিভ্রান্তকারীদের বিষয়ে সতর্ক থাকার আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর
রোববার পুরাতন কিশোরগঞ্জ স্টেডিয়ামে ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ ও ধর্মীয় ব্যক্তিত্বদের সম্মানি প্রদান অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান / ছবি: সংগৃহীত

কিশোরগঞ্জ প্রতিনিধি: দেশে বিভ্রান্তি ও গুজব ছড়ানো ব্যক্তিদের বিষয়ে জনগণকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, যারা বিভিন্ন সময়ে দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতি নিয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টির চেষ্টা করছে, তাদের অতীত কর্মকাণ্ড বিবেচনায় নিয়ে ভবিষ্যৎ ভূমিকার ওপরও নজর রাখতে হবে। একই সঙ্গে দেশের স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে বিভ্রান্তিকর প্রচারে কান না দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

রোববার বিকেলে কিশোরগঞ্জের পুরাতন কিশোরগঞ্জ স্টেডিয়ামে ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ এবং ইমাম, মুয়াজ্জিন, পুরোহিত, ভিক্ষু, পাদরিসহ বিভিন্ন ধর্মীয় ব্যক্তিত্বদের সম্মানি প্রদান অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন।

অনুষ্ঠানে জেলার নারীদের মধ্যে ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ করেন প্রধানমন্ত্রী। পাশাপাশি ইমাম, মুয়াজ্জিনসহ বিভিন্ন ধর্মীয় ব্যক্তিত্বের হাতে সম্মানির অর্থ তুলে দেওয়া হয়। অসচ্ছল ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের মধ্যে আর্থিক সহায়তার চেক বিতরণের পাশাপাশি একজন প্রতিবন্ধীর হাতে চাকরির নিয়োগপত্রও তুলে দেন তিনি।

বিভ্রান্তি ঠেকাতে অতীত কর্মকাণ্ড বিবেচনার আহ্বান

প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশে অনেক বিভ্রান্তকারী ও রটনাকারী রয়েছে। তাদের বিষয়ে জনগণকে সতর্ক থাকতে হবে। কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর বক্তব্যে বিভ্রান্ত হওয়ার আগে তাদের অতীত ভূমিকা ও কর্মকাণ্ড বিবেচনা করা প্রয়োজন।

তিনি বলেন, দেশের স্থিতিশীলতা বজায় রাখা সবার দায়িত্ব। বিভ্রান্তিকর প্রচারের কারণে যাতে জনগণের মধ্যে অস্থিরতা তৈরি না হয়, সে বিষয়ে সবাইকে সচেতন থাকতে হবে। বিভ্রান্তি সৃষ্টির চেষ্টা হলে অতীতের মতোই তার যথাযথ জবাব দেওয়ার কথাও বলেন তিনি।

বিভিন্ন রাজনৈতিক সংকটের প্রসঙ্গ তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী অভিযোগ করেন, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ, ১৯৮৬ ও ১৯৯৬ সালের রাজনৈতিক ঘটনাবলি এবং গত ১৭ বছরের গণতান্ত্রিক আন্দোলনে কিছু গোষ্ঠীর রাজপথে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা ছিল না। তার ভাষ্য অনুযায়ী, এসব সময়ের ভূমিকা বিবেচনায় নিয়েই তাদের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ কর্মকাণ্ড পর্যবেক্ষণ করা উচিত।

সংস্কার নিয়ে রাজনৈতিক বক্তব্য

সাম্প্রতিক সময়ে রাষ্ট্রীয় সংস্কার নিয়ে চলমান আলোচনা প্রসঙ্গেও বক্তব্য দেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি অভিযোগ করেন, গত ১৭ বছর রাজপথের আন্দোলনে অনুপস্থিত থাকা কিছু ব্যক্তি ও গোষ্ঠী বর্তমানে সংস্কারের নামে বড় বড় কথা বলছে এবং এর মাধ্যমে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করছে।

তারেক রহমান দাবি করেন, বিএনপি ২০২২ সালে রাষ্ট্রীয় সংস্কারের একটি রূপরেখা প্রথম জনগণের সামনে উপস্থাপন করেছিল। এরও আগে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে দেশে সংস্কারের প্রস্তাবনা তৈরি হয়েছিল বলে উল্লেখ করেন তিনি।

গত ১৭ বছরের রাজনৈতিক আন্দোলনের প্রসঙ্গ তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ওই সময়ে বিএনপি ও দলটির মিত্রদের নেতা-কর্মীরা গুম, খুন, নির্যাতন ও বিভিন্ন ধরনের অত্যাচারের শিকার হয়েছেন।

ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ডে গুরুত্ব

প্রধানমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে সরকারের সামাজিক সুরক্ষা ও জনকল্যাণমূলক কর্মসূচিগুলোর ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেন। তিনি বলেন, ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ডের কার্যকর বাস্তবায়নের পাশাপাশি ইমাম-মুয়াজ্জিনদের জন্য ভাতা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে দক্ষ ও সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ দ্রুত এগিয়ে নেওয়া প্রয়োজন।

নারীর ক্ষমতায়নের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, দেশের মোট জনগোষ্ঠীর প্রায় অর্ধেক নারী। নারীদের পেছনে রেখে কোনো দেশই টেকসই উন্নয়নের পথে এগোতে পারে না। নারীদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী ও ক্ষমতায়িত করার লক্ষ্যেই ফ্যামিলি কার্ডের মতো কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রতিটি পরিবারকে অর্থনৈতিকভাবে শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড় করানো গেলে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিও আরও শক্তিশালী হবে। নারীদের স্নাতক পর্যায় পর্যন্ত বিনা মূল্যে পড়াশোনার সুযোগ দেওয়ার পাশাপাশি ভালো ফলাফল অর্জনকারীদের সরকারি সহায়তার আওতায় আনার উদ্যোগের কথাও জানান তিনি।

কৃষকের জন্য ঋণ মওকুফ ও খাল খননের পরিকল্পনা

কৃষকদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করাকে সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার হিসেবে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, কৃষকের পাশে দাঁড়ানোর লক্ষ্যেই কৃষক কার্ড চালু করা হয়েছে।

তারেক রহমানের দাবি, ইতোমধ্যে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ সুদসহ মওকুফ করা হয়েছে। এতে দেশের প্রায় ১৩ লাখ কৃষক সরাসরি উপকৃত হয়েছেন বলে জানান তিনি।

সেচব্যবস্থা উন্নত করা এবং পানিসংকট মোকাবিলায় দেশব্যাপী খাল খননের পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি জানান, আগামীতে প্রায় ২৫০ কিলোমিটার খাল খনন কর্মসূচি বাস্তবায়নের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

কর্মসংস্থান ও শিল্পায়নে জোর

দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির জন্য নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির ওপরও গুরুত্বারোপ করেন প্রধানমন্ত্রী। তরুণ-তরুণীদের কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়াতে নতুন মিল-কারখানা ও শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেন তিনি।

তারেক রহমান বলেন, জনগণকে পেছনে রেখে কোনো দেশ এগিয়ে যেতে পারে না। কেবল বড় বড় স্লোগান দিলেই উন্নয়ন সম্ভব নয়; দেশের প্রতিটি নাগরিককে অর্থনৈতিকভাবে আত্মনির্ভরশীল করে গড়ে তুলতে হবে।

তিনি বলেন, অন্য কোনো দেশের মডেল অনুকরণ না করে বাংলাদেশকে একটি আত্মনির্ভরশীল ও কল্যাণমুখী রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তোলাই সরকারের লক্ষ্য। এমন একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার কথা জানান তিনি, যেখানে সমাজের প্রতিটি শ্রেণির মানুষ রাষ্ট্রের কাছ থেকে তার প্রাপ্য মর্যাদা ও সামর্থ্য অনুযায়ী সহায়তা পাবে।

শিক্ষা ও তরুণ প্রজন্মের জন্য নতুন পরিকল্পনা

শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়ন প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, শিক্ষার্থীদের শুধু প্রাতিষ্ঠানিক সনদের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ও ভাষাগত দক্ষতায় পারদর্শী করে তুলতে হবে। এর মাধ্যমে তরুণ প্রজন্মকে পরিপূর্ণ মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথা জানান তিনি।

শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সময় চালু হওয়া ‘নতুন কুঁড়ি’ প্রতিযোগিতা পুনরায় চালুর ঘোষণাও দেন প্রধানমন্ত্রী। তাঁর মতে, শিশু-কিশোরদের মেধা ও প্রতিভার বিকাশে প্রতিটি ক্ষেত্রে সুযোগ তৈরি করা প্রয়োজন।

ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব ও অসচ্ছল মানুষের জন্য সহায়তা

সমাজের বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের কল্যাণে সরকারের উদ্যোগ তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ইমাম, মুয়াজ্জিন, খতিবসহ বিভিন্ন ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব সমাজের দিকনির্দেশনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তাদের আত্মনির্ভরশীল রাখতে বিশেষ সামাজিক ভাতার ব্যবস্থা করা হয়েছে।

এ ছাড়া অসচ্ছল ব্যক্তি, শারীরিক প্রতিবন্ধী এবং মেধাবী শিক্ষার্থীদের জন্য রাষ্ট্রীয় সহায়তা অব্যাহত রাখার কথাও জানান তিনি।

প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, স্বৈরাচারের সময়ে বঞ্চনার শিকার ১ লাখ ২৩ হাজার শিক্ষকের অবসর ভাতাসংক্রান্ত জটিলতা নিরসন করে অর্থ প্রদান সম্পন্ন করেছে বর্তমান বিএনপি সরকার।

জনগণের ভাগ্য পরিবর্তনই লক্ষ্য

বিএনপির রাজনীতি জনগণের ভাগ্য পরিবর্তনের রাজনীতি বলে উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, শিক্ষায় সহায়তা, কৃষকের উৎপাদন বাড়ানো এবং শিল্প-কারখানা গড়ে তোলার মাধ্যমে জনগণের জীবনমান উন্নয়নই দলটির রাজনৈতিক লক্ষ্য।

নির্বাচনের আগে দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলো পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে বলেও দাবি করেন তিনি। দেশের উন্নয়ন ও মানুষের জীবনমানের পরিবর্তনকে সরকারের প্রধান লক্ষ্য হিসেবে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন ঘটাতে পারলেই দেশের ভাগ্যেরও পরিবর্তন সম্ভব।

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন সমাজকল্যাণমন্ত্রী অধ্যাপক এ জেড এম জাহিদ হোসেন। এ সময় বস্ত্র ও পাট প্রতিমন্ত্রী শরীফুল আলম, সংসদ সদস্য ফজলুর রহমান, মাজহারুল ইসলাম, জালাল উদ্দীনসহ স্থানীয় পর্যায়ের বিভিন্ন রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ব্যক্তিরা বক্তব্য দেন।


Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top