বিমান ওঠে না ৩২ বছর, তবু কুমিল্লা বিমানবন্দর থেকে মাসে কোটি টাকা রাজস্ব

কুমিল্লা প্রতিনিধি: ৩২ বছর ধরে কুমিল্লা বিমানবন্দরের রানওয়েতে ওঠানামা করছে না কোনো যাত্রীবাহী বিমান। নেই যাত্রীদের ব্যস্ততা, নেই উড়োজাহাজের নিয়মিত শব্দ। রানওয়ের বিভিন্ন অংশে আগাছা গজিয়েছে, বিমানবন্দর এলাকার কিছু জায়গায় গড়ে উঠেছে কৃষিজমিও। বাইরে থেকে দেখলে অনেকটাই পরিত্যক্ত মনে হতে পারে বিমানবন্দরটি।
তবে বাস্তবে পুরোপুরি নিষ্ক্রিয় নয় কুমিল্লা বিমানবন্দর। যাত্রীবাহী বিমান চলাচল বন্ধ থাকলেও এখানকার নেভিগেশন সেবা ব্যবহার করে প্রতিদিন আন্তর্জাতিক আকাশপথে উড়ছে বিভিন্ন দেশের উড়োজাহাজ। আর সেই সেবা থেকে সরকার প্রতি মাসে কোটি কোটি টাকা রাজস্ব পাচ্ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
৩২ বছর ধরে বন্ধ যাত্রীবাহী ফ্লাইট
কুমিল্লা নগরের ঢুলিপাড়া, নেউরা ও রাজাপাড়া এলাকায় প্রায় ৭৭ একর জায়গাজুড়ে অবস্থিত কুমিল্লা বিমানবন্দর। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ১৯৪০ সালে বিমানবন্দরটি প্রতিষ্ঠিত হয়। পরবর্তী সময়ে এখানে যাত্রীবাহী বিমান চলাচলও শুরু হয়েছিল।
১৯৯৪ সালে বিমানবন্দরটি পুনরায় চালু করা হলেও যাত্রী সংকটের কারণে মাত্র দুই সপ্তাহের মধ্যে ফ্লাইট পরিচালনা বন্ধ হয়ে যায়। এরপর দীর্ঘ ৩২ বছর ধরে কুমিল্লা বিমানবন্দরের রানওয়েতে কোনো নিয়মিত যাত্রীবাহী বিমান ওঠানামা করেনি।
নেভিগেশন সিগন্যাল ব্যবহার করছে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট
যাত্রীবাহী ফ্লাইট বন্ধ থাকলেও বিমানবন্দরের গুরুত্বপূর্ণ নেভিগেশন ব্যবস্থা সচল রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, কুমিল্লা বিমানবন্দরের DVOR ও DME নেভিগেশন সিগন্যাল ব্যবহার করে প্রতিদিন ভারত, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশের প্রায় ২৫ থেকে ৩০টি উড়োজাহাজ আন্তর্জাতিক আকাশপথে চলাচল করে।
এই নেভিগেশন ব্যবস্থা উড়োজাহাজকে নির্দিষ্ট আকাশপথে অবস্থান নির্ণয় ও চলাচলে সহায়তা করে। ফলে রানওয়েতে যাত্রীবাহী বিমান না নামলেও বিমানবন্দরটির একটি গুরুত্বপূর্ণ কারিগরি কার্যক্রম চালু রয়েছে।
নেভিগেশন সেবা থেকে মাসে ৪-৫ কোটি টাকা রাজস্ব
সংশ্লিষ্টদের দাবি, কুমিল্লা বিমানবন্দরের নেভিগেশন সিগন্যাল ব্যবহার থেকে সরকার প্রতি মাসে প্রায় ৪ থেকে ৫ কোটি টাকা রাজস্ব পেয়ে থাকে। অর্থাৎ, দীর্ঘদিন ধরে যাত্রীবাহী ফ্লাইট বন্ধ থাকলেও বিমানবন্দরটি সরকারের জন্য একটি চলমান রাজস্ব উৎস হিসেবে কাজ করছে।
বর্তমানে বিমানবন্দরে ২২ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী কর্মরত রয়েছেন বলে জানা গেছে।
পুনরায় চালুর পথে অবকাঠামোগত বাধা
কুমিল্লা বিমানবন্দরকে আবার যাত্রীসেবায় ফিরিয়ে আনতে বেশ কিছু অবকাঠামোগত উন্নয়ন প্রয়োজন বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের প্রশাসক ইউসুফ মোল্লা টিপুর মতে, বিমানবন্দরটি চালু করতে রানওয়ে সংস্কার, ফায়ার সার্ভিস ব্যবস্থা, নিয়ন্ত্রণ টাওয়ারে ভিএইচএফ সেটসহ প্রয়োজনীয় অবকাঠামো উন্নয়ন করতে হবে।
এ ছাড়া বিমানবন্দরের টেক-অফ ও ল্যান্ডিং এলাকার আশপাশে অপরিকল্পিতভাবে গড়ে ওঠা ভবনও নিরাপদ বিমান চলাচলের ক্ষেত্রে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
কুমিল্লার অর্থনীতিতে সম্ভাবনা
কুমিল্লা দেশের অন্যতম প্রবাসী অধ্যুষিত জেলা। একই সঙ্গে জেলার ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিল্পকারখানার পরিধিও দ্রুত বাড়ছে। এ অবস্থায় কুমিল্লা বিমানবন্দর পুনরায় চালু হলে স্থানীয় মানুষের পাশাপাশি প্রবাসী, ব্যবসায়ী ও শিল্প উদ্যোক্তাদের যাতায়াত সহজ হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
তাদের মতে, বিমানবন্দরটি চালু হলে কুমিল্লা থেকে ঢাকামুখী যাতায়াতের চাপ কিছুটা কমার পাশাপাশি জেলার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও গতি আসতে পারে। বিশেষ করে প্রবাসী ও ব্যবসায়ীদের জন্য সরাসরি আকাশপথের সুবিধা নতুন সম্ভাবনার সৃষ্টি করবে।
বিমান না নামলেও সম্ভাবনা রয়েছে
কুমিল্লা বিমানবন্দরের বর্তমান চিত্রে একদিকে যেমন দীর্ঘদিনের অচল যাত্রীসেবা চোখে পড়ে, অন্যদিকে নেভিগেশন সেবার মাধ্যমে এর চলমান কার্যক্রম ও রাজস্ব আয়ের বিষয়টিও সামনে আসে।
রানওয়েতে ৩২ বছর ধরে যাত্রীবাহী বিমানের চাকা না ঘুরলেও নেভিগেশন সেবা থেকে নিয়মিত রাজস্ব পাচ্ছে সরকার। প্রয়োজনীয় সংস্কার, নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও পরিকল্পিত অবকাঠামো উন্নয়ন করা গেলে কুমিল্লা বিমানবন্দরকে আবারও যাত্রীসেবায় ফিরিয়ে আনার সুযোগ রয়েছে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।



