গ্যাস সরবরাহ কমায় বাড়ল লোডশেডিং, সন্ধ্যায় ঘাটতি আড়াই হাজার মেগাওয়াট ছাড়াল

গ্যাস সরবরাহ কমায় বাড়ল লোডশেডিং, সন্ধ্যায় ঘাটতি আড়াই হাজার মেগাওয়াট ছাড়াল

দেশে এলএনজি সরবরাহ কমে যাওয়ার প্রভাব পড়েছে বিদ্যুৎ উৎপাদনে। গ্যাসের ঘাটতির সঙ্গে সন্ধ্যায় বিদ্যুতের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় বুধবার রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় লোডশেডিং বেড়েছে। সন্ধ্যার পর একাধিকবার বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় প্রচণ্ড গরমের মধ্যে দুর্ভোগে পড়েছেন সাধারণ মানুষ।

এলএনজি কার্গোর অভাবে বুধবার বেলা ৩টার দিকে এক্সিলারেট এনার্জির ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল (এফএসআরইউ) থেকে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। টার্মিনালের মজুত শেষ হয়ে যাওয়ায় এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। নতুন এলএনজি কার্গো না আসা পর্যন্ত বর্তমানে সামিটের টার্মিনালের ওপর আমদানি করা এলএনজি সরবরাহের জন্য বেশি নির্ভর করতে হচ্ছে।

গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যুৎ উৎপাদনে এর প্রভাব স্পষ্ট হতে শুরু করে। বিদ্যুৎ খাত–সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, চাহিদার তুলনায় উৎপাদন সক্ষমতা পর্যাপ্ত থাকলেও প্রয়োজনীয় গ্যাসের অভাবে অনেক বিদ্যুৎকেন্দ্র পূর্ণ সক্ষমতায় চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। এর ফলে বিকেল থেকে লোডশেডিংয়ের পরিমাণ দ্রুত বাড়তে থাকে।

এলএনজি সরবরাহ কমেছে

পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, বুধবার দুপুর ১২টায় দেশের দুটি এলএনজি টার্মিনাল থেকে জাতীয় সঞ্চালন লাইনে ঘণ্টায় প্রায় ৬৬ কোটি ১০ লাখ ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছিল। একই সময়ে দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রগুলো থেকে পাওয়া যাচ্ছিল ১৬২ কোটি ৮০ লাখ ঘনফুট গ্যাস। সব মিলিয়ে জাতীয় পর্যায়ে গ্যাসের মোট সরবরাহ ছিল ২২৮ কোটি ৯০ লাখ ঘনফুট।

তবে ছয় ঘণ্টার ব্যবধানে গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতির অবনতি হয়। সন্ধ্যা ৬টায় এলএনজি সরবরাহ কমে ৫৬ কোটি ২০ লাখ ঘনফুটে নেমে আসে। একই সময়ে দেশীয় উৎস থেকেও সরবরাহ সামান্য কমে দাঁড়ায় ১৬২ কোটি ৭০ লাখ ঘনফুটে। ফলে মোট গ্যাস সরবরাহ নেমে আসে ২১৮ কোটি ৯০ লাখ ঘনফুটে।

সরকারি হিসাব অনুযায়ী, দেশে প্রতিদিন গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুট। এর বিপরীতে বুধবার সন্ধ্যায় মোট সরবরাহ ছিল ২১৮ কোটি ৯০ লাখ ঘনফুট। অর্থাৎ চাহিদার তুলনায় ঘাটতি ছিল ১৬১ কোটি ১০ লাখ ঘনফুট। স্বাভাবিক সময়ে প্রায় ২৭০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহের মাধ্যমে বিভিন্ন খাতের চাহিদা সামাল দেওয়ার চেষ্টা করা হয়।

এক্সিলারেটের এলএনজি টার্মিনাল বন্ধ

এলএনজি কার্গো না থাকায় এক্সিলারেট এনার্জির ভাসমান টার্মিনালের মজুত বুধবার বিকেলে শেষ হয়ে যায়। বেলা ৩টার দিকে টার্মিনালটি বন্ধ হয়ে গেলে সেখান থেকে জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়।

ফলে আমদানি করা এলএনজি সরবরাহের ক্ষেত্রে সামিটের টার্মিনালের ওপর নির্ভরতা বেড়ে যায়। নতুন কার্গো না আসা পর্যন্ত এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে গ্যাস সরবরাহে আরও চাপ তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

গ্যাসের সরবরাহ কমে যাওয়ার প্রভাব সবচেয়ে বেশি দেখা যায় বিদ্যুৎ উৎপাদনে। বিশেষ করে সন্ধ্যায় যখন বিদ্যুতের চাহিদা দ্রুত বাড়ে, তখন গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উৎপাদন কমে যাওয়ায় জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ ও চাহিদার ব্যবধান বেড়ে যায়।

বিকেল থেকে বাড়তে থাকে লোডশেডিং

পাওয়ার গ্রিডের তথ্য অনুযায়ী, বুধবার সকাল ১০টায় দেশে বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৪ হাজার ১৭ মেগাওয়াট। বিপরীতে সরবরাহ ছিল ১৩ হাজার ৯০০ মেগাওয়াট। এ সময় লোডশেডিংয়ের পরিমাণ ছিল ১১৭ মেগাওয়াট।

দুপুর ২টার দিকে বিদ্যুতের চাহিদা বেড়ে ১৫ হাজার ২০৬ মেগাওয়াটে পৌঁছায়। তখন সরবরাহ ছিল ১৪ হাজার ১৩৯ মেগাওয়াট। ফলে লোডশেডিং বেড়ে দাঁড়ায় ১ হাজার ৬৭ মেগাওয়াটে।

বিকেল ৫টায় পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়। এ সময় বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৫ হাজার ৫০৪ মেগাওয়াট। বিপরীতে সরবরাহ করা হয় ১৩ হাজার ৭০০ মেগাওয়াট। ফলে লোডশেডিংয়ের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়ায় ১ হাজার ৮০৪ মেগাওয়াট।

সন্ধ্যায় বিদ্যুতের চাহিদা আরও বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ঘাটতিও দ্রুত বৃদ্ধি পায়। সন্ধ্যা ৭টায় দেশে বিদ্যুতের চাহিদা দাঁড়ায় ১৭ হাজার ৩৪৫ মেগাওয়াট। বিপরীতে সরবরাহ ছিল ১৪ হাজার ৮১৫ মেগাওয়াট। অর্থাৎ ওই সময়ে লোডশেডিং ছিল ২ হাজার ৫৩০ মেগাওয়াট।

রাত ৯টাতেও পরিস্থিতির খুব একটা উন্নতি হয়নি। এ সময় লোডশেডিং ছিল ২ হাজার ৪৪৩ মেগাওয়াট। অর্থাৎ দিনের শুরুতে যেখানে লোডশেডিং প্রায় ১১৭ মেগাওয়াট ছিল, সন্ধ্যার পর তা বেড়ে আড়াই হাজার মেগাওয়াটের বেশি হয়েছে।

রাজধানীতেও একাধিকবার বিদ্যুৎ বিভ্রাট

গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়ার প্রভাব শুধু শিল্প ও বিদ্যুৎ উৎপাদন খাতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন এলাকাতেও সন্ধ্যার পর একাধিকবার বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার খবর পাওয়া গেছে। এলাকাভিত্তিকভাবে লোডশেডিং করায় অনেক বাসিন্দাকে স্বল্প সময়ের ব্যবধানে একাধিকবার বিদ্যুৎ বিভ্রাটের মুখে পড়তে হয়েছে।

গ্রামাঞ্চলের পরিস্থিতিও তুলনামূলকভাবে বেশি খারাপ হয়েছে। তীব্র গরমের মধ্যে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় শিশু, বয়স্ক ও কর্মজীবী মানুষের ভোগান্তি বেড়েছে। বিদ্যুৎনির্ভর ব্যবসা ও ছোট শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রমও ব্যাহত হয়েছে।

বৃহস্পতিবারও লোডশেডিংয়ের আশঙ্কা

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, গ্যাস সরবরাহের পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক না হলে বিদ্যুৎ উৎপাদনে চাপ অব্যাহত থাকতে পারে। বিশেষ করে দিনের তুলনায় সন্ধ্যা ও রাতে বিদ্যুতের চাহিদা বাড়ায় ওই সময় লোডশেডিংয়ের চাপ আরও বেশি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বুধবারের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, দিনের শুরুতে বিদ্যুৎ সরবরাহ ও চাহিদার ব্যবধান তুলনামূলকভাবে কম থাকলেও বিকেল থেকে তা দ্রুত বাড়তে থাকে। একই সময়ে গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়ায় বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে উৎপাদন ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।

বিদ্যুৎ খাত–সংশ্লিষ্টদের মতে, বৃহস্পতিবার আবহাওয়া অনুকূলে না থাকলে এবং বিদ্যুতের চাহিদা বেশি থাকলে লোডশেডিংয়ের চাপ আরও বাড়তে পারে। তবে নতুন এলএনজি কার্গো এসে সরবরাহ পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে বিদ্যুৎ উৎপাদনেও কিছুটা স্বস্তি ফিরতে পারে।

সব মিলিয়ে এলএনজি সরবরাহে সাময়িক সংকটের প্রভাব দ্রুত বিদ্যুৎ খাতে দৃশ্যমান হয়েছে। বুধবার সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত বিদ্যুতের ঘাটতি কয়েক গুণ বেড়ে যাওয়ায় রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে লোডশেডিংয়ের মাত্রা বেড়েছে। গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক করা এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রয়োজনীয় জ্বালানি নিশ্চিত করাই এখন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের প্রধান চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।


Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top