২০২৭ সালে দুই শ্রেণিতে আসছে চার নতুন পাঠ্যবই, গুরুত্ব পাবে দক্ষতা ভিত্তিক শিক্ষা

মুখস্থনির্ভর ও পরীক্ষা কেন্দ্রিক শিক্ষার বাইরে গিয়ে আনন্দময়, জীবনমুখী এবং দক্ষতা ভিত্তিক শিখন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ২০২৭ শিক্ষাবর্ষে চতুর্থ ও ষষ্ঠ শ্রেণিতে চারটি নতুন পাঠ্যবই চালুর উদ্যোগ নিয়েছে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি)।
বাসসের ২৪ অক্টোবরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, চতুর্থ শ্রেণির জন্য ‘খেলাধুলা’ ও ‘বাংলাদেশের সংস্কৃতি’ এবং ষষ্ঠ শ্রেণির জন্য ‘লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস’ ও ‘আমার কারিগরি শিক্ষা’ শীর্ষক বইগুলো তৈরি করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ২৫ অক্টোবর জাতীয় শিক্ষাক্রম সমন্বয় কমিটির (এনসিসি) সভায় বইগুলোর চূড়ান্ত অনুমোদন পাওয়ার পর মুদ্রণের জন্য পাঠানো হবে।
এনসিটিবির তথ্য অনুযায়ী, চারটি বইয়ের প্রায় দেড় কোটি কপি ছাপানোর পরিকল্পনা রয়েছে। ১৫ ডিসেম্বরের মধ্যে মুদ্রণকাজ শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা উপদেষ্টা মাহ্দী আমিন বলেন, শিক্ষার্থীদের মধ্যে মানবিক মূল্যবোধ, সামাজিক শিষ্টাচার, পারিবারিক সংস্কৃতি ও সুনাগরিকের গুণাবলি গড়ে তোলার পাশাপাশি শিক্ষার সঙ্গে কর্মসংস্থানের যোগসূত্র তৈরির লক্ষ্যেই উদ্যোগটি নেওয়া হয়েছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় এনসিটিবি বিশেষজ্ঞ ও শিক্ষাবিদদের নিয়ে বইগুলোর পাণ্ডুলিপি প্রণয়ন ও পর্যালোচনার কাজ করেছে।
এনসিটিবির চেয়ারম্যান অধ্যাপক মোহাম্মদ ফখরুল মাওলা জানান, চারটি বইয়ের পাণ্ডুলিপি তৈরি ও যাচাইয়ের কাজ শেষ হয়েছে। এনসিটিবির সদস্য (পাঠ্যপুস্তক) অধ্যাপক মোহাম্মদ আবু নাসের টুকু বলেন, চূড়ান্ত অনুমোদনের পর মুদ্রণ শুরু করে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বই সরবরাহের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।
চতুর্থ শ্রেণি: খেলাধুলা ও সংস্কৃতি
‘খেলাধুলা’ বইটি ১৪টি অধ্যায়ে সাজানো হয়েছে। এনসিটিবি জানিয়েছে, এতে ফুটবল, ক্রিকেট, কাবাডি, ব্যাডমিন্টন, সাঁতার, অ্যাথলেটিকস ও দাবার মৌলিক নিয়মের পাশাপাশি কারাতে, জুডো ও তায়কোয়ান্দোর মতো আত্মরক্ষার কৌশল অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। খেলাধুলার সময় আঘাত, মচকানো, নাক দিয়ে রক্ত পড়া ও হিট স্ট্রোকের মতো পরিস্থিতিতে করণীয়, প্রাথমিক চিকিৎসা, পুষ্টি এবং সামাজিক দক্ষতার বিষয়ও এতে স্থান পেয়েছে।
বইটির একটি গল্পে প্রত্যন্ত অঞ্চলে মেয়েদের ফুটবল দল গঠন এবং সামাজিক বাধা পেরিয়ে জাতীয় পর্যায়ে সাফল্য অর্জনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরা হয়েছে। এনসিটিবির ভাষ্য, শিশুদের শারীরিক সুস্থতা, আত্মবিশ্বাস ও খেলাধুলার প্রতি আগ্রহ বাড়ানোই বইটির অন্যতম উদ্দেশ্য।
অন্যদিকে, ১১টি অধ্যায়ে প্রণীত ‘বাংলাদেশের সংস্কৃতি’ বইয়ে ভাষা, পোশাক, শিল্পকলা, খাদ্যাভ্যাস, সামাজিক রীতিনীতি ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ঐতিহ্য তুলে ধরা হয়েছে। এতে পারিবারিক সহযোগিতা, বিদ্যালয়ের উৎসব, জাতীয় পতাকা উত্তোলন এবং পিঠা-পুলির মতো সাংস্কৃতিক অনুষঙ্গও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
বইটিতে শিশু-কিশোরদের প্রতিভা অন্বেষণমূলক আয়োজন ‘নতুন কুঁড়ি’র ইতিহাস, ১৯৭৬ সালে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের উদ্যোগ এবং প্রতিযোগিতাটির বিজয়ীদের ছবি রাখার কথাও জানিয়েছে এনসিটিবি।
ষষ্ঠ শ্রেণি: আনন্দময় শিক্ষা ও কারিগরি দক্ষতা
ষষ্ঠ শ্রেণির ‘লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস’ বইটি ছয়টি অধ্যায়ে তৈরি করা হয়েছে। এনসিটিবি বলছে, এর লক্ষ্য পরীক্ষা ও মুখস্থনির্ভরতার চাপ কমিয়ে পারস্পরিক মিথস্ক্রিয়া, সহপাঠক্রমিক কার্যক্রম এবং দৈনন্দিন অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে শেখার সুযোগ তৈরি করা। স্বাস্থ্য, পরিবেশ, নিরাপত্তা, সৃজনশীলতা ও সামাজিক সম্পর্কের মতো বিষয়কে শেখার অংশ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
আটটি অধ্যায়ে সাজানো ‘আমার কারিগরি শিক্ষা’ বইয়ে হাতে-কলমে শেখা, সমস্যা সমাধান এবং প্রযুক্তির ব্যবহারিক প্রয়োগে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এতে কারিগরি শিক্ষার পরিচিতি, প্রযুক্তির পরিবর্তন, ক্ষুদ্র উদ্যোগ, উদ্ভাবন, সবুজ প্রযুক্তি ও টেকসই জীবনযাপনের বিষয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
এনসিটিবির সদস্য (শিক্ষাক্রম) অধ্যাপক এ কে এম শওকত আলী খান বলেন, নতুন বইগুলোর মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা প্রচলিত পুঁথিগত শিক্ষার বাইরে বাস্তবমুখী ও দক্ষতা ভিত্তিক জ্ঞান অর্জনের সুযোগ পাবে।
মাহ্দী আমিন জানান, পরিকল্পনা অনুযায়ী, খেলাধুলা ও সংস্কৃতিবিষয়ক বই দুটি পর্যায়ক্রমে প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত সম্প্রসারণের লক্ষ্য রয়েছে। অন্যদিকে, ‘লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস’ ও কারিগরি শিক্ষার পাঠ্যক্রম ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত চালুর পরিকল্পনা করা হয়েছে।
বইগুলোর চূড়ান্ত অনুমোদন, মুদ্রণ ও বিতরণ নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী সম্পন্ন হওয়ার ওপরই ২০২৭ শিক্ষাবর্ষে নতুন পাঠ্যক্রম বাস্তবায়নের পরবর্তী ধাপ নির্ভর করবে।


















