নুসরাত হত্যা মামলার রায় ২৪ আগস্ট, ১৬ আসামির মৃত্যুদণ্ডের আপিলের শুনানি শেষ

ফেনীর সোনাগাজীর আলোচিত মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফি হত্যা মামলায় ১৬ আসামির মৃত্যুদণ্ডের বিরুদ্ধে করা আপিল, জেল আপিল এবং মৃত্যুদণ্ড অনুমোদনের জন্য আসা ডেথ রেফারেন্সের ওপর হাইকোর্টে শুনানি শেষ হয়েছে। শুনানি শেষে হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট বেঞ্চ আগামী ২৪ আগস্ট, সোমবার, রায় ঘোষণার দিন ধার্য করেছেন।
বৃহস্পতিবার বিচারপতি ভীষ্মদেব চক্রবর্তী ও বিচারপতি কে এম রাশেদুজ্জামান রাজার সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এ দিন ধার্য করেন। রাষ্ট্রপক্ষের ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল সৈয়দ ইজাজ কবির বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, আসামিদের ডেথ রেফারেন্স, আপিল ও জেল আপিলের ওপর দীর্ঘ শুনানি শেষে আদালত রায়ের জন্য ২৪ আগস্ট দিন নির্ধারণ করেছেন।
নুসরাত হত্যা মামলার রায় ঘোষণার অপেক্ষা
২০১৯ সালের ৬ এপ্রিল সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার ছাদে নুসরাত জাহান রাফির শরীরে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। গুরুতর দগ্ধ অবস্থায় তাঁকে প্রথমে স্থানীয়ভাবে চিকিৎসা দেওয়া হয়। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকার শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের তৎকালীন বার্ন ইউনিটে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১০ এপ্রিল নুসরাতের মৃত্যু হয়।
এই ঘটনায় নুসরাতের বড় ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান সোনাগাজী থানায় মামলা করেন। তদন্তের পর মামলাটি হত্যা মামলায় রূপান্তরিত হয় এবং তদন্তে হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনা, সহযোগিতা ও বাস্তবায়নের সঙ্গে ১৬ জনের সংশ্লিষ্টতার কথা উঠে আসে।
মামলার বিচার শেষে ২০১৯ সালের ২৪ অক্টোবর ফেনীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল ঐতিহাসিক রায় দেন। রায়ে মাদ্রাসার তৎকালীন অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলাসহ ১৬ আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।
১৬ আসামির মৃত্যুদণ্ড
নুসরাত জাহান রাফি হত্যা মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ১৬ আসামির মধ্যে রয়েছেন মাদ্রাসার বরখাস্ত অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলা, সোনাগাজী উপজেলা আওয়ামী লীগের তৎকালীন সভাপতি রুহুল আমিন, সোনাগাজী পৌরসভার তৎকালীন কাউন্সিলর মাকসুদুল আলম, মাদ্রাসার শিক্ষক হাফেজ আবদুল কাদের এবং প্রভাষক আফসার উদ্দিন।
এ ছাড়া মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত অন্য আসামিরা হলেন মাদ্রাসার ছাত্র নুর উদ্দিন, শাহাদাত হোসেন শামীম, সাইফুর রহমান মোহাম্মদ যোবায়ের, জাবেদ হোসেন ওরফে সাখাওয়াত হোসেন জাবেদ, কামরুন নাহার মনি, উম্মে সুলতানা পপি ওরফে তুহিন, আবদুর রহিম শরিফ, ইফতেখার উদ্দিন রানা, ইমরান হোসেন মামুন, মোহাম্মদ শামীম ও মহি উদ্দিন শাকিল।
ট্রাইব্যুনালের রায়ের পর মামলাটির নথিপত্র মৃত্যুদণ্ড অনুমোদনের জন্য হাইকোর্টে পাঠানো হয়। ২০১৯ সালের ২৯ অক্টোবর ডেথ রেফারেন্সের নথি হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট শাখায় পৌঁছায়। পরে এটি ডেথ রেফারেন্স মামলা নম্বর ১৪০/২০১৯ হিসেবে নথিভুক্ত হয়।
হাইকোর্টে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে শুনানি
চাঞ্চল্যকর ও বহুল আলোচিত এই মামলাটি দ্রুত নিষ্পত্তির লক্ষ্যে হাইকোর্টে ডেথ রেফারেন্সের পেপারবুক প্রস্তুত করা হয়। একই সঙ্গে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরা পৃথকভাবে আপিল ও জেল আপিল করেন। ডেথ রেফারেন্স, আপিল ও জেল আপিল—সবগুলো বিষয় একসঙ্গে শুনানির উদ্যোগ নেওয়া হয়।
নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনসংক্রান্ত ডেথ রেফারেন্স, আপিল ও অন্যান্য মামলা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে শুনানির জন্য গত ১০ জুন প্রধান বিচারপতি বিচারপতি ভীষ্মদেব চক্রবর্তী ও বিচারপতি কে এম রাশেদুজ্জামান রাজার সমন্বয়ে একটি বিশেষ বেঞ্চ গঠন করেন। বেঞ্চটি ১৪ জুন থেকে কার্যক্রম শুরু করে।
নুসরাত হত্যা মামলাটি এই বেঞ্চে গত ২৮ জুলাই শুনানির জন্য ওঠে। এরপর রাষ্ট্রপক্ষ ও আসামিপক্ষের আইনজীবীরা ধারাবাহিকভাবে তাঁদের বক্তব্য উপস্থাপন করেন। মামলার নথি, সাক্ষ্য, প্রমাণ এবং নিম্ন আদালতের রায়ের বিভিন্ন দিক নিয়ে উভয় পক্ষের মধ্যে বিস্তারিত আইনি যুক্তি উপস্থাপিত হয়।
রাষ্ট্রপক্ষ ও আসামিপক্ষের শুনানি
হাইকোর্টে রাষ্ট্রপক্ষে শুনানিতে ছিলেন অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল। তাঁর সঙ্গে ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল সৈয়দ ইজাজ কবির, মোহাম্মদ ইমাম হোসেন তারেক এবং সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল মো. আল আমিন সিদ্দিকী, মাহবুবা তাসনিম আঁখি ও মোছা. রোহানী সিদ্দীকা আদালতে উপস্থিত ছিলেন।
অন্যদিকে আসামিপক্ষে শুনানিতে অংশ নেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনসুরুল হক চৌধুরী, এস এম শাহজাহান, মোহাম্মদ শিশির মনির, খন্দকার মুশফিকুল হুদা ও এস এম মাসুদ হোসেন দোলনসহ অন্য আইনজীবীরা।
শুনানি শেষে আদালত মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ রাখেন। এখন আগামী ২৪ আগস্ট হাইকোর্টের রায়ে ১৬ আসামির মৃত্যুদণ্ড বহাল থাকবে কি না, কিংবা রায়ে কোনো পরিবর্তন আসবে কি না—সেদিকেই নজর সংশ্লিষ্টদের।
কীভাবে ঘটেছিল নুসরাত হত্যাকাণ্ড
মামলার নথি অনুযায়ী, ২০১৯ সালের ২৭ মার্চ সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার তৎকালীন অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলা তাঁর কক্ষে ডেকে নুসরাতের শ্লীলতাহানি করেন। এ ঘটনায় নুসরাতের পরিবারের পক্ষ থেকে মামলা করা হলে অধ্যক্ষকে গ্রেপ্তার করা হয়।
অভিযোগ রয়েছে, ওই মামলা প্রত্যাহার এবং অধ্যক্ষের পক্ষে অবস্থান নেওয়ার জন্য নুসরাত ও তাঁর পরিবারকে চাপ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু মামলা প্রত্যাহারে রাজি না হওয়ায় ৬ এপ্রিল নুসরাতকে মাদ্রাসার একটি ভবনের ছাদে ডেকে নেওয়া হয়। সেখানে তাঁর হাত-পা বেঁধে শরীরে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়।
অগ্নিদগ্ধ অবস্থায় নুসরাতকে প্রথমে ফেনী ও পরে ঢাকায় নেওয়া হয়। চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১০ এপ্রিল তাঁর মৃত্যু হয়। নুসরাতের মৃত্যুর পর ঘটনাটি দেশজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে এবং দ্রুত বিচার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি ওঠে।
এখন কী হতে পারে
নুসরাত জাহান রাফি হত্যা মামলার বিচারিক আদালতের রায়ে ১৬ আসামির মৃত্যুদণ্ড হয়েছিল। সেই রায়ের পর আইন অনুযায়ী মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার আগে মামলাটি ডেথ রেফারেন্স হিসেবে হাইকোর্টে আসে। একই সঙ্গে আসামিদের করা আপিল ও জেল আপিলও শুনানির জন্য গ্রহণ করা হয়।
হাইকোর্টের রায়ের পর মামলাটির পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়া নির্ভর করবে আদালতের সিদ্ধান্তের ওপর। মৃত্যুদণ্ড বহাল, পরিবর্তন বা অন্য কোনো আদেশ—যে সিদ্ধান্তই আসুক, সংশ্লিষ্ট পক্ষের জন্য পরবর্তী আইনি প্রতিকার গ্রহণের সুযোগ আইন অনুযায়ী থাকবে।
দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর নুসরাত জাহান রাফি হত্যা মামলাটি এখন হাইকোর্টে রায় ঘোষণার পর্যায়ে পৌঁছেছে। ২৪ আগস্টের রায় তাই নুসরাতের পরিবার, আসামিপক্ষ এবং দেশজুড়ে আলোচিত এই মামলার পরবর্তী আইনি গতিপথের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।



