এলডিসি উত্তরণ এ বাড়তি ৩ বছর চায় বাংলাদেশ, সিদ্ধান্ত আসতে পারে এ মাসেই

ঢাকা: স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের প্রস্তুতিকাল আরও তিন বছর বাড়ানোর বিষয়ে চলতি মাসেই সিদ্ধান্ত আসতে পারে বলে আশা করছে বাংলাদেশ। আগামী সপ্তাহের মধ্যে সিদ্ধান্ত পাওয়ার প্রত্যাশা করছেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির।
গতকাল ঢাকায় ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরামের (ইআরএফ) কার্যালয়ে বাংলাদেশের এলডিসি উত্তরণ, সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ নিয়ে আয়োজিত এক সেমিনারে তিনি এ কথা বলেন। ইআরএফ ও বাংলাদেশ ফরেন ট্রেড ইনস্টিটিউট (বিএফটিআই) যৌথভাবে এ সেমিনারের আয়োজন করে।
বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, ‘এলডিসি উত্তরণ পিছিয়ে দেওয়ার বিষয়ে আগামী সপ্তাহের মধ্যে সিদ্ধান্ত পাওয়ার আশা করছি। কোনো কারণে দেরি হলে চলতি মাসের মধ্যেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসবে।’
বাংলাদেশের উত্তরণ পেছানোর প্রস্তাব দিয়েছে উন্নয়নশীল দেশগুলোর জোট জি-৭৭। অন্যদিকে, বাংলাদেশের আবেদনের প্রতি সমর্থন জানিয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)।
বাংলাদেশের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে জাতিসংঘের উন্নয়ন নীতিবিষয়ক কমিটি (সিডিপি) প্রস্তুতিকাল বাড়ানোর সুপারিশ করলেও নির্দিষ্ট সময়সীমা উল্লেখ করেনি। তবে জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদ (ইকোসক) বাংলাদেশকে তিন বছর সময় বাড়িয়ে দেওয়ার জন্য সাধারণ পরিষদের কাছে সুপারিশ করেছে।
আগামী ২৪ নভেম্বর বাংলাদেশ, নেপাল ও লাওসের এলডিসি থেকে উত্তরণের নির্ধারিত সময়। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ সময় বাড়ানোর অনুমোদন না দিলে ওই তারিখেই দেশগুলোর উত্তরণ কার্যকর হওয়ার কথা। উত্তরণের পর অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্যসুবিধা ও অন্যান্য বিশেষ সহায়তা হারানোর ঝুঁকি মোকাবিলায় বাংলাদেশ ও নেপাল প্রস্তুতিকাল বাড়ানোর আবেদন করেছে।
রপ্তানি বাজার ধরে রাখতে বাণিজ্য চুক্তিতে জোর
এলডিসি উত্তরণের পরও প্রধান রপ্তানি বাজারগুলোতে শুল্কমুক্ত সুবিধা ধরে রাখতে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি করছে বাংলাদেশ। বাণিজ্যমন্ত্রী জানান, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে ইতিমধ্যে বাণিজ্য চুক্তি করেছে বাংলাদেশ। সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে চুক্তি নিয়ে আলোচনা আগামী মাসে শেষ হওয়ার আশা রয়েছে।
এ ছাড়া ওমান, সিঙ্গাপুর, নিউজিল্যান্ডসহ আরও আট থেকে ১০টি দেশের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তির আলোচনা চলতি বছরের শেষ নাগাদ অথবা আগামী বছরের মধ্যে শেষ করার লক্ষ্য রয়েছে।
বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রপ্তানি বাজার ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে মুক্তবাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) নিয়ে আলোচনা ২০২৯ সালে নির্ধারিত উত্তরণের আগেই শেষ করার আশা করছে সরকার। এ আলোচনার জন্য উভয় পক্ষ প্রধান কারিগরি কর্মকর্তা নিয়োগ করেছে বলে জানান মুক্তাদির।
তিনি আরও বলেন, উত্তরণ-পরবর্তী মসৃণ রূপান্তরের প্রস্তুতি তুলে ধরে বাংলাদেশ ইইউর কাছে সময়সীমাবদ্ধ কর্মপরিকল্পনা জমা দিয়েছে। তিন বছর সময় বাড়ানোর বিষয়টি বিবেচনায় রেখেই এ প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।
আঞ্চলিক বাণিজ্য জোট রিজিওনাল কমপ্রিহেনসিভ ইকোনমিক পার্টনারশিপের (আরসিইপি) সদস্য হওয়ারও চেষ্টা করছে বাংলাদেশ। দেশটির আবেদনের মূল্যায়নে একটি কার্যকরী দল গঠন করেছে জোটটি।
উত্তরণের পর রপ্তানিতে বড় ঝুঁকির আশঙ্কা
বিএফটিআইয়ের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোস্তফা আবিদ খান বলেন, এলডিসি উত্তরণের পর প্রথম দুই বছরে বাংলাদেশের ৯৩ শতাংশের বেশি রপ্তানি প্রভাবমুক্ত থাকবে।
তিনি জানান, কানাডা, জাপান, যুক্তরাজ্য ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন—বাংলাদেশের মোট রপ্তানির ৮৬ শতাংশের বেশি যে বাজারগুলোতে যায়—উত্তরণের পর তিন বছর শুল্কমুক্ত বাজারসুবিধা অব্যাহত রাখতে সম্মত হয়েছে।
তবে দীর্ঘমেয়াদে রপ্তানির প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ও বাজারসুবিধা ধরে রাখতে প্রধান বাণিজ্য অংশীদারদের সঙ্গে চুক্তি করা জরুরি বলে মনে করেন আবিদ খান। প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ না নিলে বাংলাদেশের রপ্তানি ২৬ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে বলে সতর্ক করেন তিনি।
২০২৯ সাল পর্যন্ত প্রস্তুতির সময় চায় সরকার
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ক্ষমতায় আসার পর বিএনপি সরকার সিডিপির সভাপতির কাছে চিঠি দিয়ে বাংলাদেশের এলডিসি উত্তরণের প্রস্তুতিকাল ২০২৯ সালের ২৪ নভেম্বর পর্যন্ত বাড়ানোর অনুরোধ জানায়। আন্তর্জাতিক বাজারে বাড়তি প্রতিযোগিতার জন্য প্রস্তুতি নিতে আরও সময় প্রয়োজন বলে চিঠিতে উল্লেখ করা হয়।
এদিকে, এলডিসি থেকে উত্তরণকারী দেশগুলোর জন্য জাতিসংঘের সহায়তা কাঠামো পর্যালোচনা ও হালনাগাদ করতে একটি কার্যকরী দল গঠন করা হয়েছে। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের মন্ত্রী পর্যায়ের ঘোষণায় বলা হয়েছে, ‘ওয়ার্কিং গ্রুপ অন স্মুথ ট্রানজিশন ফর গ্র্যাজুয়েটিং এলডিসিজ’-এর নেতৃত্বে থাকবেন অ্যাঙ্গোলা ও ফিনল্যান্ডের স্থায়ী প্রতিনিধিরা।




















