মেসির অবসর: আর্জেন্টিনা জাতীয় দলকে বিদায় মেসির, ২১ বছরের এক মহাকাব্যের শেষ

মেসির অবসর: আর্জেন্টিনা জাতীয় দলকে বিদায় মেসির, ২১ বছরের এক মহাকাব্যের শেষ
মেসির অবসর: আর্জেন্টিনা অধিনায়ক লিওনেল মেসি / ইনস্টাগ্রাম ছবি: সংগৃহীত

অবশেষে বিদায় বললেন মেসি, ভিজল আর্জেন্টাইনদের হৃদয়

অবশেষে সেই দিনটি এল।

যে দিনটির কথা ভাবতেও হয়তো ভয় পেতেন কোটি কোটি আর্জেন্টাইন সমর্থক। আকাশি-সাদা জার্সি গায়ে লিওনেল মেসিকে আর দেখা যাবে না—এ কথাটি এখন বাস্তব।

আর্জেন্টিনা জাতীয় দল থেকে অবসরের ঘোষণা দিয়েছেন ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা এই তারকা।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে আজ দীর্ঘ এক আবেগঘন পোস্টে নিজের সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছেন ৩৯ বছর বয়সী মেসি। বিশ্বকাপ ফাইনালের পর অনেক দিন ধরে ভাবার পরই জাতীয় দল থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি।

‘(বিশ্বকাপ) ফাইনালের পর এতদিন সময় যাওয়ার পর, অনেক ভেবেচিন্তে আমি আপনাদের সবাইকে জানাতে চাই যে আমি জাতীয় দল থেকে অবসর নিচ্ছি।’

কয়েকটি শব্দ। অথচ সেই শব্দগুলোতেই যেন থেমে গেল আর্জেন্টাইন ফুটবলের একটি যুগ।

২০০৫ সালে শুরু হয়েছিল যাত্রা। তখন তরুণ এক মেসি। চোখে স্বপ্ন, পায়ে জাদু। আর সামনে ছিল দীর্ঘ এক পথ—যে পথে ছিল হতাশা, কান্না, ব্যর্থতা, সমালোচনা এবং শেষ পর্যন্ত অবিশ্বাস্য সব অর্জন।

২১ বছর পর সেই পথের শেষ প্রান্তে এসে দাঁড়ালেন মেসি

গত ৮ আগস্ট বাবাকে হারানোর পর তাঁর অবসর নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছিল। তবে মেসি জানিয়েছেন, বিশ্বকাপ ফাইনালের দুই দিন পরই তিনি জাতীয় দল থেকে বিদায় নেওয়ার ভাবনা লিখে রেখেছিলেন। বাবার মৃত্যুর পর সিদ্ধান্তটি নিয়ে আরও নিশ্চিত হন তিনি।

মেসির অবসর: আর্জেন্টিনা জাতীয় দলকে বিদায় মেসির, ২১ বছরের এক মহাকাব্যের শেষ
মেসির অবসর: আর্জেন্টিনা অধিনায়ক লিওনেল মেসি / ইনস্টাগ্রাম ছবি: সংগৃহীত

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের লেখা সেই কথাগুলোর ছবিও প্রকাশ করেছেন মেসি।

‘এই কথাগুলো আমি ২১ জুলাই লিখেছিলাম, ফাইনালের দুই দিন পর। আজ আমার বাবার ঘটনার পর, আমি আগের চেয়েও বেশি নিশ্চিত।’

মেসির আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার অবশ্য শুধু সাফল্যের গল্প নয়। দীর্ঘ সময় ধরে আর্জেন্টিনার হয়ে বড় কোনো শিরোপা না জেতার আক্ষেপ তাঁকে তাড়া করেছে। সমালোচনাও শুনতে হয়েছে কম নয়।

২০১৬ সালের কোপা আমেরিকা ফাইনালে হারের পর একবার অভিমানে জাতীয় দল থেকেই অবসরের ঘোষণা দিয়েছিলেন তিনি।

সেদিন অনেকেরই মনে হয়েছিল, হয়তো সত্যিই শেষ হয়ে গেল সবকিছু।

কিন্তু মেসির গল্প তখনো শেষ হয়নি।

তিনি ফিরেছিলেন।

আর ফিরে এসে বদলে দিয়েছিলেন নিজের এবং আর্জেন্টিনা ফুটবলের ইতিহাস।

২০২১ সালে কোপা আমেরিকা জয়ের মধ্য দিয়ে শুরু হয় নতুন এক অধ্যায়। এরপর চার বছরে আর্জেন্টিনাকে এনে দেন দুটি কোপা আমেরিকা, ফিনালিসিমা এবং বিশ্বকাপের শিরোপা।

যে মেসিকে একসময় শুনতে হয়েছিল, জাতীয় দলের হয়ে তিনি কিছুই জেতেননি—শেষ পর্যন্ত তিনিই হয়ে ওঠেন আর্জেন্টিনার সবচেয়ে গৌরবময় সময়ের প্রধান মুখ।

সর্বশেষ বিশ্বকাপেও থেমে থাকেননি তিনি। টুর্নামেন্টটির ইতিহাসে সর্বোচ্চ গোলদাতার রেকর্ড গড়ার পাশাপাশি দলকে তুলেছিলেন ফাইনালে। তবে শিরোপা নির্ধারণী ম্যাচে স্পেনের কাছে ১–০ গোলে হেরে যায় আর্জেন্টিনা

সেই হারই হয়তো শেষ পর্যন্ত তাঁকে বিদায়ের সিদ্ধান্তের দিকে নিয়ে গেছে।

তবে সিদ্ধান্তটি সহজ ছিল না।

‘এটি এমন এক সিদ্ধান্ত, যা আমার আত্মাকে ব্যথিত করেছে এবং এখনো করছে। তবে আমি বুঝতে পারছি যে এটাই সঠিক সময়,’ লিখেছেন মেসি।

এরপর যেন নিজের পুরো আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের হিসাব দিলেন তিনি।

‘আমি আপনাদের কসম করে বলছি, সবসময় নিজের সবটুকু উজাড় করে দিয়েছি—শুধু গত কয়েক বছরে যা কিছু জিতেছি তখন নয়, তার আগেও।’

আর্জেন্টিনার জার্সিতে মেসির পথচলা সংখ্যাতেও অনন্য। ২০৭ ম্যাচে ১২৫ গোল। দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ গোলদাতা তিনি।

তবে মেসির কাছে সংখ্যার চেয়েও বড় ছিল হয়তো সেই জার্সি।

যে জার্সি পরে তিনি কেঁদেছেন।

হেরেছেন।

সমালোচনা শুনেছেন।

আবার সেই জার্সি পরেই জিতেছেন পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সব শিরোপা।

আর্জেন্টাইন সমর্থকদের উদ্দেশে মেসি লিখেছেন, ‘এই জার্সির জন্য, আপনাদের আনন্দ দিতে এবং ফুটবলের মাধ্যমে আপনাদের আর্জেন্টাইন হওয়ার গর্ববোধ করানোর জন্য আমি সবসময় লড়াই করেছি এবং সর্বস্ব বিলিয়ে দিয়েছি।’

এখন তাঁর মনে হচ্ছে, দেওয়ার মতো আর কিছু বাকি নেই।

আর সামনে অপেক্ষা করছে নতুন প্রজন্ম।

‘নিজেকে সম্পূর্ণ উজাড় করে দিয়েছি, আমার দেওয়ার মতো আর কিছু বাকি নেই। তাছাড়া পেছনে অনেক দুর্দান্ত তরুণ খেলোয়াড় আসছে, যাদের জাতীয় দলে থাকাটা প্রাপ্য।’

বিদায় নিচ্ছেন মেসি, কিন্তু আর্জেন্টিনার সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক শেষ হচ্ছে না।

এখন থেকে তিনি থাকবেন গ্যালারিতে না হলেও দূরে কোথাও, কোটি কোটি সমর্থকের মতোই দলের পাশে।

‘গত ২০ বছরের সমস্ত ভালোবাসার জন্য ধন্যবাদ। মাঠের ভেতরে আপনাদের চিৎকার ও সমর্থন শোনাটা খুব মিস করব। এখন থেকে আমি আপনাদের মতোই একজন হয়ে যাব, যে বাইরে থেকে সবসময় দলকে সমর্থন দিয়ে যাবে এবং পাশে থাকবে—ভালো সময়ে তো বটেই, খারাপ সময়ে আরও বেশি।’

পরিবার, সতীর্থ, কোচ এবং দীর্ঘ এই যাত্রায় পাশে থাকা সবাইকেও ধন্যবাদ জানিয়েছেন মেসি।

বিদায়ের মুহূর্তেও তাঁর কণ্ঠে আছে শান্তি। কারণ, এত বছর ধরে যে স্বপ্নের পেছনে ছুটেছেন, শেষ পর্যন্ত সতীর্থদের সঙ্গে মিলেই সেই স্বপ্নের অনেকটাই পূরণ করতে পেরেছেন।

‘সতীর্থদের সঙ্গে নিয়ে আপনাদের স্বপ্নের মতো কিছু মুহূর্ত উপহার দিতে পারার শান্তি আর গর্ব নিয়ে আমি বিদায় নিচ্ছি।’

তারপর শেষ কথা।

হয়তো কোটি কোটি আর্জেন্টাইন সমর্থকের হৃদয় ছুঁয়ে যাওয়ার মতোই দুটি বাক্য—

‘আমাকে আর্জেন্টাইন বানানোর জন্য ঈশ্বরকে ধন্যবাদ। ভামোস আর্জেন্টিনা!’


Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top