ম্যাকাই টেস্ট এ শরীফুলের ৬ উইকেট, ৬৪ রানে অলআউট হয়েও ঘুরে দাঁড়াল বাংলাদেশ
বাংলাদেশ প্রথম ইনিংস: ৩৪ ওভারে ৬৪ (শরীফুল ১৪, তাইজুল ১১*; স্টার্ক ৬/১২)।
অস্ট্রেলিয়া প্রথম ইনিংস: ৪০ ওভারে ১৬৫/৮ (গ্রিন ৫১*, স্মিথ ৪২; শরীফুল ৬/৩৫)।

ম্যাকাই: শুরুটা হয়েছিল দুঃস্বপ্নের মতো। মাত্র ৬৪ রানে অলআউট বাংলাদেশ। নতুন বলে মিচেল স্টার্কের তাণ্ডবে প্রথম ইনিংসে ব্যাটিং বিপর্যয়ে পড়ার পর মনে হচ্ছিল, ম্যাকাই টেস্ট এ প্রথম দিনটি পুরোপুরি অস্ট্রেলিয়ার দখলে চলে গেছে। কিন্তু দিনের শেষ সেশনে ম্যাচের চিত্রই বদলে দিলেন বাঁহাতি পেসার শরীফুল ইসলাম।
চোট থেকে পুরোপুরি সেরে না ওঠায় ডারউনে সিরিজের প্রথম টেস্টে খেলতে পারেননি শরীফুল। ম্যাকাইয়ে ফিরেই তিনি দেখালেন, কেন বাংলাদেশের পেস আক্রমণে তাঁকে এত গুরুত্বপূর্ণ মনে করা হয়। অসাধারণ সুইং, বাউন্স ও সিম মুভমেন্ট কাজে লাগিয়ে অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিং লাইনআপে একের পর এক আঘাত হানলেন তিনি।
দিন শেষে অস্ট্রেলিয়ার ৮ উইকেটের ৬টিই নিয়েছেন শরীফুল। টেস্ট ক্রিকেটে এটি তাঁর প্রথম পাঁচ উইকেটের কীর্তি, আর সেখানেই থামেননি তিনি। পরে মিচেল স্টার্ককে বোল্ড করে নিজের শিকার নিয়ে গেছেন ছয়ে। ফলে ভয়াবহ ব্যাটিং বিপর্যয়ের পরও প্রথম দিন শেষে বাংলাদেশের জন্য ম্যাচে ফেরার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
৬৪ রানে গুটিয়ে গেল বাংলাদেশ
টসে হেরে ব্যাটিংয়ে নামা বাংলাদেশের জন্য সকালটা ছিল অত্যন্ত কঠিন। ম্যাকাইয়ের গ্রেট ব্যারিয়ার রিফ অ্যারেনার উইকেটে নতুন বলে দুর্দান্ত সহায়তা পেয়েছেন মিচেল স্টার্ক। তাঁর গতি, সুইং ও নিখুঁত লাইন-লেংথের সামনে বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানরা কার্যত অসহায় হয়ে পড়েন।
একপর্যায়ে মাত্র ১২ রানেই বাংলাদেশের পাঁচ উইকেট পড়ে যায়। তখন টেস্ট ক্রিকেটে সর্বনিম্ন দলীয় সংগ্রহের রেকর্ড ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কাও তৈরি হয়েছিল। বাংলাদেশ নিজেদের সর্বনিম্ন ৪৩ রান এবং অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে কোনো দলের সর্বনিম্ন ৪৫ রানের রেকর্ডের কাছাকাছি চলে গিয়েছিল।
পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয় যখন ৩৯ রানে পড়ে যায় বাংলাদেশের নবম উইকেট। শেষ পর্যন্ত ৬৪ রানে থামে বাংলাদেশের প্রথম ইনিংস।
লাঞ্চে যাওয়ার সময় বাংলাদেশের স্কোর ছিল ৬ উইকেটে ৩৫। বিরতির পর আরও ২৯ রান যোগ করে শেষ চার উইকেট হারায় দলটি। ব্যাটিং বিপর্যয়ের মধ্যেও শরীফুলের উপস্থিতি কিছুটা স্বস্তি দিয়েছে বাংলাদেশকে। তাইজুল ইসলামের সঙ্গে তাঁর ২৫ রানের জুটিই ছিল ইনিংসে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ জুটি।
স্টার্কের বিধ্বংসী শুরু
বাংলাদেশের ইনিংসে মিচেল স্টার্ক ছিলেন পুরোপুরি অপ্রতিরোধ্য। ইনিংসের সপ্তম ওভারের মধ্যেই নিজের প্রথম পাঁচ উইকেট পূর্ণ করেন অস্ট্রেলিয়ার এই বাঁহাতি পেসার। মাত্র ৩.৪ ওভার বা ২২ বলেই পাঁচ উইকেট নেন তিনি।
আর কয়েকটি বলের মধ্যে আরও একটি উইকেট পেলে টেস্টের এক ইনিংসে দ্রুততম পাঁচ উইকেটের নিজের রেকর্ডের কাছাকাছি চলে যেতেন স্টার্ক। গত বছরের ১৪ জুলাই কিংস্টনের সাবাইনা পার্কে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে মাত্র ১৫ বলে পাঁচ উইকেট নিয়ে টেস্ট ইতিহাসে দ্রুততম পাঁচ উইকেটের রেকর্ড গড়েছিলেন তিনি।
ম্যাকাই টেস্ট এ বাংলাদেশের বিপক্ষে তাঁর শুরুটিও সেই বিধ্বংসী পারফরম্যান্সেরই আরেকটি উদাহরণ হয়ে থাকল।
শরীফুলের জবাবেই ম্যাচে ফিরল বাংলাদেশ
বাংলাদেশের ৬৪ রানের জবাবে ব্যাটিংয়ে নেমে শুরুতেই তাসকিন আহমেদের বলে ম্যাট রেনশকে হারায় অস্ট্রেলিয়া। এরপর বল হাতে নিয়ন্ত্রণ নিতে শুরু করেন শরীফুল।
ইনিংসের অষ্টম ওভারে মাত্র কয়েকটি বলের ব্যবধানে ট্রাভিস হেড ও মারনাস লাবুশেনকে ফিরিয়ে দেন তিনি। হেডের বিপক্ষে শরীফুলের ডেলিভারিটি ছিল বিশেষভাবে নজরকাড়া। অফ স্টাম্পের বাইরে পড়ে বলটি দ্রুত ভেতরে ঢুকে ব্যাটের ভেতরের কানা ছুঁয়ে থাই প্যাডে লাগে এবং পরে স্টাম্প ভেঙে দেয়।
২৭ বলে ২২ রান করে কিছুটা সেট হয়ে উঠেছিলেন হেড। কিন্তু শরীফুলের অসাধারণ ডেলিভারিতে তাঁর ইনিংস থেমে যায়।
এরপর স্টিভেন স্মিথ ও বো ওয়েবস্টারকে এলবিডব্লিউ করে ফেরান বাংলাদেশের বাঁহাতি পেসার। দুই ক্ষেত্রেই বল ভেতরের দিকে ঢুকে ব্যাটসম্যানকে বিভ্রান্ত করেছে। রিভিউ নিয়েও শেষ পর্যন্ত বাঁচতে পারেননি তাঁরা।
ক্যামেরন গ্রিনের প্রতিরোধ
অস্ট্রেলিয়ার ইনিংসের চতুর্থ উইকেটে স্টিভেন স্মিথ ও ক্যামেরন গ্রিনের মধ্যে ৭৭ রানের জুটি তৈরি হয়েছিল। তখন মনে হচ্ছিল, দ্রুত উইকেট হারানোর ধাক্কা সামলে স্বাগতিক দল আবার ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিতে যাচ্ছে।
কিন্তু স্মিথের বিদায়ের পর আবারও চাপে পড়ে অস্ট্রেলিয়া। ক্যামেরন গ্রিন এক প্রান্ত আগলে রাখলেও অন্য প্রান্তে নিয়মিত উইকেট পড়তে থাকে।
৩১তম ওভারে মেহেদী হাসান মিরাজকে আক্রমণে এনে সাফল্য পান অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত। মিরাজের বলে মিড-অনে ক্যাচ তুলে দিয়ে ফিরে যান অ্যালেক্স ক্যারি।
এর পরের ওভারেই আবার জোড়া আঘাত হানেন শরীফুল। প্রথমে বো ওয়েবস্টারকে এলবিডব্লিউ করে নিজের পঞ্চম উইকেট পূর্ণ করেন তিনি। একই ওভারের পঞ্চম বলে বাউন্সারে অস্ট্রেলিয়ার অধিনায়ক প্যাট কামিন্স ক্যাচ তুলে দেন। উইকেটকিপার লিটন দাস সহজেই ক্যাচটি তালুবন্দী করেন।
টেস্টে প্রথমবার পাঁচ উইকেট পাওয়ার আনন্দ তখন শরীফুলের। কিন্তু তাঁর সাফল্যের গল্প সেখানেই শেষ হয়নি।
ছয় উইকেট নিয়ে শরীফুলের নতুন কীর্তি
নিজের পরের ওভারেই মিচেল স্টার্ককে বোল্ড করে অস্ট্রেলিয়ার অষ্টম উইকেট তুলে নেন শরীফুল। এর ফলে টেস্টে নিজের প্রথম পাঁচ উইকেটের কীর্তিকে ছয় উইকেটে নিয়ে যান তিনি।
দিন শেষে অস্ট্রেলিয়ার স্কোর দাঁড়ায় ৮ উইকেটে ১৬৫। ক্যামেরন গ্রিন ৫১ রানে অপরাজিত আছেন। তাঁর সঙ্গে নবম উইকেটে নাথান লায়নের অবিচ্ছিন্ন জুটি থেকে এসেছে ১৭ রান।
অর্থাৎ বাংলাদেশের ৬৪ রানের বিপরীতে অস্ট্রেলিয়া এখনো এগিয়ে থাকলেও স্বাগতিকদের আট উইকেট তুলে নিয়ে ম্যাচে সমানভাবে ফেরার সুযোগ তৈরি করেছে বাংলাদেশ।
ম্যাকাইয়ের উইকেটে পেসারদের জন্য সহায়তা
ম্যাচের প্রথম দিনে দুই দলের ইনিংসের চিত্র দেখলেই বোঝা যায়, ম্যাকাইয়ের উইকেটে পেসাররা কতটা সুবিধা পেয়েছেন। বাউন্সে অসামঞ্জস্য, সিম মুভমেন্ট এবং বাতাসের কারণে সুইং—সবকিছুই কাজে লাগিয়েছেন স্টার্ক ও শরীফুল।
অস্ট্রেলিয়ার পেসার জশ হ্যাজলউডও ইনিংস বিরতিতে উইকেটের এই বৈশিষ্ট্যের কথা তুলে ধরেন। তাঁর মতে, উইকেটে বোলারদের জন্য কিছুটা সহায়তা ছিল। বাউন্সে কিছুটা অসামঞ্জস্য এবং সিম মুভমেন্টের পাশাপাশি বাতাসের কারণে সুইংও হচ্ছিল। তবে সময় গড়ানোর সঙ্গে উইকেট কিছুটা ব্যাটিংবান্ধব হয়ে আসে।
হ্যাজলউডের মতে, এ ধরনের উইকেটে প্রথম ২০ ওভার টিকে থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু বাংলাদেশ সেই পরীক্ষায় ব্যর্থ হয়েছে। মাত্র ১৬ ওভারের মধ্যেই ছয় উইকেট হারিয়ে ফেলে তারা।
ব্যাটসম্যানদের ভুলেও বিপর্যয়
শুধু উইকেটের আচরণকে বাংলাদেশের ব্যাটিং বিপর্যয়ের একমাত্র কারণ হিসেবে দেখা যাচ্ছে না। প্রথম ইনিংসে অন্তত কয়েকজন ব্যাটসম্যান এমন শট খেলেছেন, যেগুলোর সঙ্গে উইকেটের প্রতিকূলতার সরাসরি সম্পর্ক ছিল না।
অর্থাৎ, ম্যাকাইয়ের কঠিন কন্ডিশন যেমন বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের পরীক্ষা নিয়েছে, তেমনি কিছু ভুল সিদ্ধান্তও বিপর্যয়কে আরও গভীর করেছে।
তারপরও প্রথম দিন শেষ হওয়ার আগে ম্যাচের গল্প বদলে দিয়েছেন শরীফুল ইসলাম। দিনের শুরুতে বাংলাদেশ যেখানে ৬৪ রানে গুটিয়ে গিয়ে বড় ব্যবধানে পিছিয়ে পড়েছিল, দিনের শেষভাগে সেই দলই অস্ট্রেলিয়ার আটটি উইকেট তুলে নিয়ে ম্যাচে ফেরার আশা তৈরি করেছে।
ডারউনে প্রথম টেস্টে না থাকা শরীফুলের ম্যাকাই প্রত্যাবর্তন তাই হয়ে উঠেছে বাংলাদেশের জন্য দিনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। একদিকে স্টার্কের আগুনে বোলিংয়ে বাংলাদেশ ধসে পড়েছে, অন্যদিকে শরীফুলের আগুনঝরা স্পেলে অস্ট্রেলিয়াও একই দিনে বড় ধাক্কা খেয়েছে।
ম্যাকাই টেস্টের প্রথম দিন তাই শুধু অস্ট্রেলিয়ার দাপটের গল্প নয়; শরীফুল ইসলামের হাত ধরে বাংলাদেশের ঘুরে দাঁড়ানোর গল্পও।



