জ্বালানি সংকট এ ব্যবসা-শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত, ঋণখেলাপিতেও প্রভাব: অর্থমন্ত্রী

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা: জ্বালানি সংকটের কারণে দেশের ব্যবসা ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো নানা ধরনের চাপের মুখে পড়ছে বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেছেন, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সংকট উৎপাদন ও ব্যবসায়িক কার্যক্রমকে বাধাগ্রস্ত করছে, যার প্রভাব পড়ছে প্রতিষ্ঠানগুলোর ঋণ পরিশোধ সক্ষমতা এবং সামগ্রিকভাবে খেলাপি ঋণের ওপরও।
শনিবার (২২ আগস্ট) রাজধানীর মতিঝিলে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই) অডিটরিয়ামে আয়োজিত এক সেমিনারে তিনি এসব কথা বলেন।
‘২০২৬ অর্থবছরের দ্বিবার্ষিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি; প্রেক্ষিত রাজস্ব ও মুদ্রানীতি এবং বেসরকারি খাতের প্রত্যাশা’ শীর্ষক সেমিনারে অর্থমন্ত্রী বলেন, জ্বালানি সরবরাহের সীমাবদ্ধতা ব্যবসা ও শিল্প খাতের ওপর যে চাপ তৈরি করছে, তা বিবেচনায় নিয়েই সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংক বিভিন্ন নীতিগত উদ্যোগ নিচ্ছে।
ঋণ পুনঃতফসিল ও গ্রেস পিরিয়ডের সুযোগ
জ্বালানি সংকটসহ বিভিন্ন কারণে যেসব ব্যবসা ও শিল্পপ্রতিষ্ঠান আর্থিক চাপে পড়েছে, তাদের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক ঋণ পুনঃতফসিল ও গ্রেস পিরিয়ডসহ একটি প্যাকেজ দিয়েছে বলে জানান আমির খসরু।
অর্থমন্ত্রী বলেন, ব্যবসায়িক বাস্তবতার কারণে কেউ যদি প্রতিষ্ঠান পরিচালনা থেকে বের হয়ে যেতে চান, তাঁদের জন্যও নীতিগত সুযোগ রাখা হয়েছে। অর্থাৎ আর্থিক সংকটে পড়া ব্যবসা ও উদ্যোক্তাদের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি বিবেচনা করে সমাধানের পথ তৈরি করার চেষ্টা করা হচ্ছে।
তিনি জানান, বাংলাদেশ ব্যাংকের এই প্যাকেজ আগামী ১ সেপ্টেম্বর থেকে কার্যকর হওয়ার কথা রয়েছে। নির্ধারিত যোগ্যতা পূরণ করার পরও কোনো ব্যবসায়ী বা উদ্যোক্তা ব্যাংক থেকে প্রয়োজনীয় সুবিধা পেতে বাধার মুখে পড়লে সরকারকে বিষয়টি জানানোর আহ্বান জানান তিনি।
অর্থমন্ত্রীর বক্তব্যে উঠে আসে, বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে ব্যাংকিং খাতের ঋণ ব্যবস্থাপনাতেও বাস্তবভিত্তিক পরিবর্তন আনা জরুরি। শুধু কাগজে-কলমে ঋণকে সচল দেখিয়ে রাখার পরিবর্তে প্রকৃত আর্থিক অবস্থার প্রতিফলন ঘটাতে হবে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
ব্যাংকের ব্যালান্সশিট পরিষ্কার করার তাগিদ
ব্যাংকিং খাতে মানসিকতার পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়ে আমির খসরু বলেন, কোনো ঋণ ব্যাংকের ব্যালান্সশিটে থাকলেও বাস্তবে যদি তা ফেরত পাওয়ার সম্ভাবনা না থাকে, তাহলে শুধু হিসাবের খাতায় সেটিকে ঋণ হিসেবে ধরে রাখার কোনো অর্থ নেই।
তাঁর মতে, ব্যাংকের ব্যালান্সশিট পরিষ্কার করার পাশাপাশি প্রকৃত তারল্য নিশ্চিত করতে হবে। এতে আর্থিক খাতের প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট হবে এবং ব্যাংকগুলোও নতুন করে অর্থায়নের সক্ষমতা অর্জন করতে পারবে।
অর্থমন্ত্রী আরও বলেন, আর্থিক খাতকে কার্যকর রাখতে ব্যাংকগুলোর ঋণ বিতরণ ও আদায়ের ক্ষেত্রে বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনা করা প্রয়োজন। ব্যবসা ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে অযথা চাপে না ফেলে সক্ষম ও যোগ্য উদ্যোক্তাদের অর্থায়নের সুযোগ তৈরি করাই হবে গুরুত্বপূর্ণ।
ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের জন্য ৬০ হাজার কোটি টাকার প্যাকেজ
দেশের ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি শিল্প খাতকে সহায়তা করতে ৬০ হাজার কোটি টাকার একটি প্যাকেজ নেওয়া হয়েছে বলেও জানান অর্থমন্ত্রী।
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ উল্লেখ করে তিনি বলেন, এই খাতের ব্যবসায়ীদের অর্থায়নের সুযোগ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। তবে অতীতে এ ধরনের অর্থায়নে অনিয়ম এবং প্রভাবশালী মহলের হস্তক্ষেপের অভিযোগ ছিল বলেও স্বীকার করেন তিনি।
আমির খসরু বলেন, ভবিষ্যতে নির্ধারিত মানদণ্ড পূরণকারী ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তাদেরই ব্যাংক ঋণ দেওয়ার সুযোগ দিতে হবে। রাজনৈতিক পরিচয়, প্রভাব বা পৃষ্ঠপোষকতার ভিত্তিতে অর্থায়নের ব্যবস্থা রাখা হবে না।
জ্বালানি মজুদ বাড়ানোর উদ্যোগ
অর্থমন্ত্রী বলেন, দায়িত্ব নেওয়ার সময় দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ খাতে জ্বালানি ও প্রয়োজনীয় পণ্যের মজুদের পরিস্থিতি অত্যন্ত নাজুক ছিল। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ১৫ থেকে ১৭ দিনের মজুদও ছিল না।
বর্তমানে সেই পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলোতে মজুদের পরিমাণ প্রায় এক মাসে উন্নীত করা হয়েছে এবং পর্যায়ক্রমে প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ খাতে তিন মাসের মজুদ গড়ে তোলার চেষ্টা চলছে বলে জানান তিনি।
তাঁর মতে, অর্থনৈতিক কার্যক্রম সচল রাখতে জ্বালানি নিরাপত্তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পর্যাপ্ত জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা না গেলে শিল্প উৎপাদন, বিনিয়োগ ও ব্যবসায়িক কার্যক্রমে অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে।
বিদ্যুৎ ও গ্যাস পরিস্থিতির উন্নতিতে সময় লাগবে
দেশের বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকটের স্থায়ী সমাধানে সময় প্রয়োজন বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেন, সরকার পরিস্থিতির উন্নয়নে সর্বাত্মক চেষ্টা করছে এবং প্রয়োজনীয় সম্পদ কাজে লাগানো হচ্ছে। তবে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহের সব বিষয় সরকারের একক নিয়ন্ত্রণে নেই বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
শিল্প খাতকে বর্তমান বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে ব্যবসায়িক পরিকল্পনা করার পরামর্শ দিয়ে আমির খসরু বলেন, ধীরে ধীরে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের পরিস্থিতির উন্নতি হবে।
জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তার কারণে শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর উৎপাদন ব্যাহত হলে তার প্রভাব অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে ছড়িয়ে পড়তে পারে। এ কারণে শিল্প ও ব্যবসা খাতের জন্য জ্বালানি নিরাপত্তাকে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ব্যাংকিং ব্যবস্থার প্রতিশ্রুতি
ব্যাংকিং ও আর্থিক খাত পরিচালনায় রাজনৈতিক প্রভাব বন্ধ করার বিষয়ে সরকারের অবস্থানও তুলে ধরেন অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেন, ভবিষ্যতে কোনো রাজনৈতিক প্রভাব বা পৃষ্ঠপোষকতার সুযোগ রাখা হবে না।
আর্থিক খাতে রাজনৈতিক নিয়োগও দেওয়া হবে না বলে জানান তিনি। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, নির্ধারিত মানদণ্ড পূরণকারী ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তাদেরই ব্যাংক থেকে ঋণ পাওয়ার সুযোগ থাকতে হবে।
আমির খসরু বলেন, আর্থিক খাতকে বাজারের নিয়ম অনুযায়ী পরিচালনা করতে হবে। একই সঙ্গে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ব্যাংকিং ব্যবস্থা গড়ে তুলতে সরকার কাজ করছে।
শিল্প খাতের জন্য সামনে বড় চ্যালেঞ্জ
জ্বালানি সংকট, ঋণ পরিশোধের চাপ এবং ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা—এই তিনটি বিষয় বর্তমানে ব্যবসা ও শিল্প খাতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। সরকারের নেওয়া ঋণ পুনঃতফসিল, গ্রেস পিরিয়ড এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের জন্য অর্থায়ন প্যাকেজ কতটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হয়, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
বিশেষ করে বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতি না হলে শুধু আর্থিক সহায়তা দিয়ে শিল্প খাতের সংকট পুরোপুরি কাটানো কঠিন হতে পারে। তাই জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি ব্যাংকিং খাতে স্বচ্ছতা, ঋণ ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত অর্থায়ন নিশ্চিত করার ওপর জোর দিচ্ছে সরকার।
অর্থমন্ত্রীর বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে, বর্তমান সংকট মোকাবিলায় সরকার একদিকে শিল্প ও ব্যবসা খাতকে আর্থিকভাবে সহায়তা দিতে চায়, অন্যদিকে ব্যাংকিং ব্যবস্থায় দীর্ঘদিনের অনিয়ম ও রাজনৈতিক প্রভাব কমিয়ে একটি বাজারভিত্তিক কাঠামো প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য নিয়েছে। তবে এসব উদ্যোগের বাস্তব ফল নির্ভর করবে সেগুলোর যথাযথ বাস্তবায়ন এবং বিদ্যুৎ-গ্যাসসহ জ্বালানি সরবরাহ পরিস্থিতির কতটা দ্রুত উন্নতি করা যায় তার ওপর।
