ক্যালিফোর্নিয়ায় বিশেষ নির্বাচন

বিপুল অর্থ ব্যয়ের পরও আয়শা ওয়াহাবের জয়, ক্যালিফোর্নিয়ার বিশেষ নির্বাচনে বড় বার্তা

আয়শা ওয়াহাবের জয়, ইসরায়েলপন্থীদের কোটি ডলারের প্রচারণাও ব্যর্থ
আয়শা ওয়াহাবের জয় / আয়শা ওয়াহাব ছবি: এএফপি

ক্যালিফোর্নিয়া: যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যের ১৪তম কংগ্রেশনাল ডিস্ট্রিক্টের বিশেষ নির্বাচনে জয় পেয়েছেন অঙ্গরাজ্য সিনেটর আয়শা ওয়াহাব। ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রার্থী মেলিসা হার্নান্দেজকে পরাজিত করে মার্কিন কংগ্রেসের প্রতিনিধি পরিষদে যাওয়ার পথ তৈরি করেছেন তিনি। নির্বাচনে ওয়াহাবের প্রতিদ্বন্দ্বীকে সমর্থন দিতে ইসরায়েলপন্থী বিভিন্ন রাজনৈতিক গোষ্ঠী বিপুল অর্থ ব্যয় করলেও শেষ পর্যন্ত তাঁর জয় ঠেকানো যায়নি।

মার্কিন সংবাদমাধ্যমগুলোর পূর্বাভাস অনুযায়ী, বৃহস্পতিবারের নির্বাচনে ওয়াহাব জয়ী হয়েছেন। এর ফলে ক্যালিফোর্নিয়ার ১৪তম কংগ্রেশনাল ডিস্ট্রিক্টের প্রতিনিধি হিসেবে সাবেক কংগ্রেস সদস্য এরিক সোয়ালওয়েলের মেয়াদের বাকি সময় দায়িত্ব পালন করবেন তিনি। সোয়ালওয়েল গত এপ্রিলে পদত্যাগ করার পর আসনটি শূন্য হয় এবং সেই শূন্যতা পূরণ করতেই বিশেষ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।

ওয়াহাবের জয় শুধু একটি কংগ্রেসনাল আসনের ফল নয়; নির্বাচনে বড় অঙ্কের রাজনৈতিক ব্যয়, গাজা যুদ্ধ নিয়ে প্রার্থীদের অবস্থান এবং মার্কিন রাজনীতিতে ইসরায়েলপন্থী গোষ্ঠীগুলোর প্রভাব নিয়েও নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে।

‘ভোটারদের অর্থ দিয়ে কেনা সম্ভব নয়’

জয়ের পর দেওয়া বক্তব্যে আয়শা ওয়াহাব তাঁর রাজনৈতিক যাত্রা ও নির্বাচনী এলাকার মানুষের সঙ্গে নিজের সম্পর্কের কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, যে এলাকা তাঁকে বড় করেছে, সেই এলাকার মানুষের অধিকার রক্ষায় তিনি কাজ করে যাবেন।

নির্বাচনে তাঁর বিরুদ্ধে পরিচালিত নেতিবাচক প্রচারণা এবং প্রতিদ্বন্দ্বীর পক্ষে বিপুল অর্থ ব্যয়ের প্রসঙ্গও উঠে আসে ওয়াহাবের বক্তব্যে। তাঁর মতে, নির্বাচনের ফল প্রমাণ করেছে যে এই আসনের ভোটারদের অর্থের বিনিময়ে প্রভাবিত করা যায় না।

ওয়াহাব তাঁর ব্যক্তিগত জীবনসংগ্রামের কথাও উল্লেখ করেন। ফস্টার কেয়ারে বেড়ে ওঠা থেকে মার্কিন কংগ্রেসে পৌঁছানোর সম্ভাব্য এই যাত্রাকে তিনি একটি অনুপ্রেরণামূলক উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেন। তাঁর ভাষায়, এই অভিজ্ঞতা দেখায় যে কঠিন পরিস্থিতির মধ্যেও মানুষের স্বপ্ন বাস্তবায়ন সম্ভব।

ক্যালিফোর্নিয়ার অঙ্গরাজ্য আইনসভায় দায়িত্ব পালনকালে ওয়াহাব অর্থনৈতিক ও সামাজিক ন্যায়বিচার, শ্রমজীবী মানুষের অধিকার এবং বিভিন্ন সামাজিক ইস্যুতে সক্রিয় ছিলেন। কংগ্রেসে নির্বাচিত হলে তিনি প্রথম আফগান বংশোদ্ভূত মার্কিন কংগ্রেস সদস্য হওয়ার নজিরও গড়বেন।

কীভাবে বিশেষ নির্বাচন হলো

সাবেক কংগ্রেস সদস্য এরিক সোয়ালওয়েল পদত্যাগ করার পর তাঁর আসনটি শূন্য হয়। তাঁর বিরুদ্ধে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ ওঠার পর তিনি পদত্যাগ করেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে সোয়ালওয়েল ওই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

তাঁর পদত্যাগের কারণে ক্যালিফোর্নিয়ার ১৪তম কংগ্রেশনাল ডিস্ট্রিক্টে বিশেষ নির্বাচনের আয়োজন করা হয়। নির্বাচনী এলাকাটি সান ফ্রান্সিসকো বে এলাকার দক্ষিণ-পূর্ব অংশের বিস্তীর্ণ এলাকা নিয়ে গঠিত।

বিশেষ নির্বাচনের প্রাথমিক ধাপে ওয়াহাবই শক্ত অবস্থানে ছিলেন। জুনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে তিনি ৪২ শতাংশের বেশি ভোট পান। তাঁর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী মেলিসা হার্নান্দেজ পেয়েছিলেন প্রায় ১৭ শতাংশ ভোট।

তবে মূল নির্বাচন যত এগিয়েছে, দুই প্রার্থীর ব্যবধান কমে আসে। ফলে শেষপর্যায়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা আরও জোরালো হয়ে ওঠে এবং প্রচারণায় অর্থ ব্যয়ের মাত্রাও বাড়তে থাকে।

আয়শা ওয়াহাবের গাজা যুদ্ধ নিয়ে অবস্থান

নির্বাচনী প্রচারণায় পররাষ্ট্রনীতি প্রধান ইস্যু না হলেও গাজা যুদ্ধ নিয়ে আয়শা ওয়াহাবের অবস্থান আগে থেকেই স্পষ্ট। ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যের আইনসভায় তিনি গাজায় মানবিক পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন এবং যুদ্ধ বন্ধের আহ্বান জানিয়ে একটি প্রস্তাব পাসের উদ্যোগ নিয়েছিলেন।

এ বছরের এপ্রিলে অনুষ্ঠিত একটি নির্বাচনী বিতর্কে ওয়াহাবকে জিজ্ঞাসা করা হয়, ফিলিস্তিনিদের ওপর চলমান পরিস্থিতিকে তিনি ‘জাতিগত হত্যা’ হিসেবে বিবেচনা করেন কি না। জবাবে তিনি সরাসরি ‘হ্যাঁ’ বলেন।

অন্যদিকে তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী মেলিসা হার্নান্দেজ একই প্রশ্নের সরাসরি উত্তর দেননি। তিনি ইসরায়েলের আত্মরক্ষার অধিকারের কথা বলার পাশাপাশি গাজায় ধ্বংসযজ্ঞ সীমা ছাড়িয়ে গেছে বলেও মন্তব্য করেন।

এই অবস্থান দুই প্রার্থীর পররাষ্ট্রনীতি ও মধ্যপ্রাচ্য ইস্যুতে দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্যকে সামনে নিয়ে আসে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রে গাজা যুদ্ধ নিয়ে রাজনৈতিক মতপার্থক্য বাড়ার মধ্যে ক্যালিফোর্নিয়ার এই নির্বাচনটি সেই বিতর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হয়ে ওঠে।

আয়শাকে হারাতে কোটি কোটি ডলারের প্রচারণা

নির্বাচনের শেষপর্বে ওয়াহাবের বিরুদ্ধে প্রচারণায় বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয়ের বিষয়টি বিশেষভাবে আলোচনায় আসে। মার্কিন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আগস্টের শুরু থেকে মেলিসা হার্নান্দেজকে সমর্থন দিতে ইউনাইটেড ডেমোক্রেসি প্রজেক্ট প্রায় ২৫ লাখ ডলার ব্যয় করেছে।

সংগঠনটি ইসরায়েলপন্থী প্রভাবশালী রাজনৈতিক গোষ্ঠী আমেরিকান ইসরায়েল পাবলিক অ্যাফেয়ার্স কমিটি বা আইপ্যাকের সঙ্গে যুক্ত বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এ ছাড়া আইপ্যাকের অর্থায়ন পাওয়া আরেকটি সংগঠন বোল্ড আমেরো হার্নান্দেজের পক্ষে প্রায় ১৯ লাখ ডলার ব্যয় করেছে বলে সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

ফলে বিশেষ নির্বাচনটি কেবল স্থানীয় রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সীমাবদ্ধ থাকেনি। যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে বিশেষ স্বার্থগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক প্রভাব, বিশেষ করে ইসরায়েলপন্থী লবির ভূমিকা নিয়েও এটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হিসেবে দেখা হয়েছে।

ইসরায়েলপন্থী গোষ্ঠীগুলোর জন্য নির্বাচনের বার্তা

যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন নির্বাচনে ইসরায়েলপন্থী রাজনৈতিক গোষ্ঠীগুলো বিপুল অর্থ ব্যয় করে প্রার্থীদের সমর্থন বা বিরোধিতা করে আসছে। তবে ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে এমন অর্থনির্ভর প্রচেষ্টার কার্যকারিতা নিয়ে একাধিকবার প্রশ্ন উঠেছে।

ক্যালিফোর্নিয়ার এই ফল সেই বিতর্ককে আরও জোরালো করতে পারে। কারণ, বিপুল অর্থ ব্যয়ের প্রচারণার পরও গাজা ইস্যুতে তুলনামূলকভাবে কঠোর অবস্থান নেওয়া ওয়াহাব জয় পেয়েছেন।

তবে নির্বাচনের ফলকে সরাসরি কেবল গাজা বা ইসরায়েল ইস্যুর প্রতিফলন হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। স্থানীয় অর্থনীতি, সামাজিক ন্যায়বিচার, স্বাস্থ্যসেবা, শ্রমিকদের অধিকার এবং প্রার্থীদের ব্যক্তিগত রাজনৈতিক অবস্থানও ভোটারদের সিদ্ধান্তে ভূমিকা রেখেছে।

নভেম্বরেই আবার মুখোমুখি ওয়াহাব-হার্নান্দেজ

বিশেষ নির্বাচনের এই জয় আপাতত আয়শা ওয়াহাবকে ক্যালিফোর্নিয়ার ১৪তম কংগ্রেশনাল ডিস্ট্রিক্টের প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার সুযোগ দেবে। তবে আসনটির পূর্ণ দুই বছরের মেয়াদের জন্য লড়াই শেষ হয়নি।

আগামী নভেম্বরে ওয়াহাব ও হার্নান্দেজের আবার মুখোমুখি হওয়ার কথা রয়েছে। সেই নির্বাচনে বিজয়ী প্রার্থী কংগ্রেসের প্রতিনিধি পরিষদে ক্যালিফোর্নিয়ার ১৪তম ডিস্ট্রিক্টের পূর্ণ দুই বছরের মেয়াদে দায়িত্ব পালন করবেন।

ফলে বর্তমান জয়কে ওয়াহাবের রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে দেখা হলেও নভেম্বরের নির্বাচনই হবে আরও বড় পরীক্ষা।

প্রগতিশীল ডেমোক্র্যাটদের অভিনন্দন

ওয়াহাবের জয়ের পর ক্যালিফোর্নিয়ার প্রগতিশীল ডেমোক্রেটিক রাজনীতিক রো খান্না তাঁকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। তিনি সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা, জীবনযাপনের উপযোগী মজুরি এবং ইরান যুদ্ধ বন্ধের মতো বিভিন্ন ইস্যুতে ওয়াহাবের সঙ্গে কাজ করার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন।

আয়শা ওয়াহাবের এই জয় একই সঙ্গে মার্কিন কংগ্রেসে প্রগতিশীল ডেমোক্র্যাটদের জন্যও একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা। বিশেষ করে অভিবাসী ও সংখ্যালঘু পটভূমি থেকে উঠে আসা একজন রাজনীতিকের কংগ্রেসে প্রবেশ মার্কিন রাজনীতিতে প্রতিনিধিত্বের বৈচিত্র্যকে আরও বাড়াবে।

ক্যালিফোর্নিয়ার এই বিশেষ নির্বাচনের ফল তাই স্থানীয় একটি আসনের রাজনৈতিক পালাবদলের চেয়েও বেশি তাৎপর্য বহন করছে। বিপুল অর্থের প্রচারণার মধ্যেও ওয়াহাবের জয় দেখিয়েছে, ভোটারদের সিদ্ধান্তে অর্থের পাশাপাশি প্রার্থীর রাজনৈতিক অবস্থান, স্থানীয় ইস্যু এবং ব্যক্তিগত রাজনৈতিক পরিচয়ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। আগামী নভেম্বরে পূর্ণ মেয়াদের নির্বাচনে তাঁর এই সাফল্য কতটা স্থায়ী হয়, এখন সেদিকেই নজর থাকবে।


Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top