ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়াতে পারে যেসব খাবার, কী বলছে গবেষণা

ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়াতে পারে যেসব খাবার

ক্যানসার একটি জটিল রোগ, যার পেছনে জেনেটিক, পরিবেশগত ও জীবনযাপনসংক্রান্ত একাধিক কারণ কাজ করে। খাদ্যাভ্যাসও এসব ঝুঁকির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তবে কোনো একটি খাবার খেলেই ক্যানসার হবে—এমন সরল সম্পর্ক নেই। বরং দীর্ঘদিনের অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবার, প্রক্রিয়াজাত মাংস, অ্যালকোহল, তামাক এবং অতিরিক্ত ওজনসহ একাধিক বিষয় মিলেই ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) তথ্য অনুযায়ী, স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম, স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখা এবং তামাক ও অ্যালকোহল এড়িয়ে চলা ক্যানসারের ঝুঁকি কমাতে সহায়তা করতে পারে।

তাহলে কোন খাবার বা খাদ্যাভ্যাস নিয়ে সতর্ক হওয়া দরকার? গবেষণায় যেসব খাবার ও উপাদানের সঙ্গে ক্যানসারের ঝুঁকির সম্পর্ক পাওয়া গেছে, সেগুলো সম্পর্কে জানা থাকলে দৈনন্দিন খাদ্যাভ্যাসে সচেতন হওয়া সহজ হয়।

কারসিনোজেন কী?

কারসিনোজেন হলো এমন কোনো রাসায়নিক, শারীরিক বা জৈবিক উপাদান, যা ক্যানসার সৃষ্টির ঝুঁকি বাড়াতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কারসিনোজেনের মধ্যে তামাকের ধোঁয়ার বিভিন্ন উপাদান, অ্যালকোহল, কিছু রাসায়নিক পদার্থ, অতিবেগুনি ও আয়নাইজিং বিকিরণ এবং নির্দিষ্ট কিছু সংক্রমণকে অন্তর্ভুক্ত করেছে।

খাবারের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও জটিল। কিছু খাবার সরাসরি ক্যানসারের কারণ হিসেবে প্রমাণিত, আবার কিছু খাবার বা রান্নার পদ্ধতির ক্ষেত্রে ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্ক পাওয়া গেলেও মানুষের ওপর প্রমাণ সব ক্ষেত্রে একই মাত্রার নয়।

১. প্রক্রিয়াজাত মাংস

সসেজ, হটডগ, হ্যাম, বেকন, কর্নড বিফসহ লবণ দেওয়া, ধূমায়িত, কিউরিং, ফারমেন্টেশন বা সংরক্ষণের জন্য বিভিন্ন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাওয়া মাংসকে প্রক্রিয়াজাত মাংস বলা হয়।

আন্তর্জাতিক ক্যানসার গবেষণা সংস্থা (IARC) প্রক্রিয়াজাত মাংসকে মানুষের জন্য কারসিনোজেন হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করেছে। বিশেষ করে এর সঙ্গে কোলোরেক্টাল বা বৃহদান্ত্র ও মলাশয়ের ক্যানসারের সম্পর্কের পক্ষে পর্যাপ্ত প্রমাণ পাওয়া গেছে। WHO-এর তথ্য অনুযায়ী, প্রতিদিন ৫০ গ্রাম প্রক্রিয়াজাত মাংস খাওয়ার সঙ্গে কোলোরেক্টাল ক্যানসারের ঝুঁকি প্রায় ১৮ শতাংশ বাড়ার সম্পর্ক পাওয়া গেছে।

তবে এর অর্থ এই নয় যে একবার সসেজ বা অন্য কোনো প্রক্রিয়াজাত মাংস খেলেই ক্যানসার হবে। ঝুঁকি মূলত দীর্ঘমেয়াদি ও বেশি পরিমাণে গ্রহণের সঙ্গে সম্পর্কিত।

২. অতিরিক্ত তাপে রান্না করা মাংস

মাংস উচ্চ তাপমাত্রায় রান্না করলে কিছু রাসায়নিক যৌগ তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে গ্রিল, বারবিকিউ, সরাসরি আগুনে ঝলসানো বা খুব বেশি তাপে ভাজার সময় হেটেরোসাইক্লিক অ্যারোমেটিক অ্যামাইনস (HCA) এবং পলিসাইক্লিক অ্যারোমেটিক হাইড্রোকার্বন (PAH) তৈরি হতে পারে।

মাংসের চর্বি আগুনে পড়ে ধোঁয়া তৈরি করলে সেই ধোঁয়ার কিছু উপাদান খাবারের গায়ে জমতে পারে। ফলে মাংস পুড়িয়ে বা অতিরিক্ত কালো করে খাওয়ার অভ্যাস এড়িয়ে চলা ভালো।

তবে রান্নার নির্দিষ্ট পদ্ধতি মানুষের ক্যানসারের ঝুঁকি কতটা বাড়ায়, সে বিষয়ে সব প্রশ্নের চূড়ান্ত উত্তর এখনো নেই। তাই উচ্চ তাপে রান্না করা মাংসকে নিয়ে সতর্ক থাকা উচিত, কিন্তু একে ক্যানসারের নিশ্চিত কারণ হিসেবে উপস্থাপন করা ঠিক নয়।

৩. ফ্রেঞ্চ ফ্রাই, চিপস ও অতিরিক্ত সেঁকা খাবার

আলু ও কিছু শর্করা-সমৃদ্ধ খাবার উচ্চ তাপমাত্রায় রান্না করলে অ্যাক্রিলামাইড নামের একটি রাসায়নিক তৈরি হতে পারে। ফ্রেঞ্চ ফ্রাই, আলুর চিপস, ক্র্যাকার, রুটি, বিস্কুট ও কুকিজসহ বিভিন্ন খাবারে অ্যাক্রিলামাইড পাওয়া যেতে পারে।

অ্যাক্রিলামাইড নিয়ে উদ্বেগের কারণ হলো প্রাণীর ওপর গবেষণায় উচ্চ মাত্রার সংস্পর্শে ক্যানসারের ঝুঁকি দেখা গেছে। তবে মানুষের ক্ষেত্রে খাবারের মাধ্যমে অ্যাক্রিলামাইড গ্রহণ ও ক্যানসারের মধ্যে এখনো কোনো সুসংগত সম্পর্ক প্রমাণিত হয়নি। তাই চিপস বা ফ্রেঞ্চ ফ্রাইকে সরাসরি ‘ক্যানসার সৃষ্টিকারী খাবার’ বলা বৈজ্ঞানিকভাবে অতিরঞ্জিত হবে।

তবে এসব খাবারে অতিরিক্ত লবণ, অস্বাস্থ্যকর চর্বি ও ক্যালরি থাকতে পারে। তাই স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের অংশ হিসেবে এগুলো সীমিত রাখাই ভালো।

৪. অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত ও ফাস্টফুড

চিপস, চানাচুর, প্যাকেটজাত স্ন্যাকস, ফাস্টফুড, অতিরিক্ত লবণ ও চিনি থাকা খাবার নিয়মিত বেশি পরিমাণে খাওয়ার অভ্যাস সামগ্রিকভাবে অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের অংশ হতে পারে।

WHO বলছে, স্বাস্থ্যকর খাদ্যের ভিত্তি হওয়া উচিত কম প্রক্রিয়াজাত বা অপরিবর্তিত খাবার, ফল, সবজি, ডাল, সম্পূর্ণ শস্য এবং স্বাস্থ্যকর প্রোটিনের বৈচিত্র্যময় সমন্বয়। অন্যদিকে অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবারে প্রায়ই বেশি পরিমাণে লবণ, চিনি বা অস্বাস্থ্যকর চর্বি থাকে।

এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, প্রতিটি প্রক্রিয়াজাত খাবারকে ক্যানসার সৃষ্টিকারী বলা যাবে না। বরং দীর্ঘদিনের খাদ্যাভ্যাস এবং খাবারের সামগ্রিক মান বিবেচনা করা প্রয়োজন।

ক্ষতিকর চর্বি সমৃদ্ধ খাবার ক্যানসারের ঝুঁকি বৃদ্ধি করে
ছবি: পেক্সেলস

৫. ট্রান্সফ্যাট ও অস্বাস্থ্যকর চর্বিযুক্ত খাবার

ট্রান্সফ্যাট হৃদ্‌রোগসহ বিভিন্ন স্বাস্থ্যঝুঁকির সঙ্গে যুক্ত। তবে ট্রান্সফ্যাটকে সরাসরি ক্যানসারের নিশ্চিত কারণ হিসেবে উল্লেখ করার ক্ষেত্রে প্রমাণ প্রক্রিয়াজাত মাংস বা অ্যালকোহলের মতো শক্তিশালী নয়।

তাই অতিরিক্ত ভাজাপোড়া, প্যাকেটজাত স্ন্যাকস ও অস্বাস্থ্যকর ফ্যাটসমৃদ্ধ খাবার কমানো উচিত—শুধু ক্যানসারের কথা বিবেচনা করে নয়, সামগ্রিক স্বাস্থ্য রক্ষার জন্যও।

৬. অ্যালকোহল

খাবারের সঙ্গে অ্যালকোহলকে এক করে দেখা ঠিক না হলেও ক্যানসারের ঝুঁকি নিয়ে আলোচনা করলে অ্যালকোহল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। WHO ও IARC-এর তথ্য অনুযায়ী, অ্যালকোহল ক্যানসারের প্রতিষ্ঠিত কারণ এবং মুখগহ্বর, গলা, স্বরযন্ত্র, খাদ্যনালি, লিভার, কোলন-রেকটাম ও নারীদের স্তন ক্যানসারসহ একাধিক ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ায়।

অ্যালকোহল শরীরে ভেঙে অ্যাসিটালডিহাইড তৈরি করে, যা ডিএনএ ক্ষতির সঙ্গে যুক্ত। অ্যালকোহল গ্রহণের পরিমাণ যত বাড়ে, সাধারণভাবে ক্যানসারের ঝুঁকিও তত বাড়ে। WHO-এর মতে, ক্যানসারের ক্ষেত্রে অ্যালকোহল গ্রহণের কোনো নিরাপদ মাত্রা প্রতিষ্ঠিত হয়নি।

৭. তামাকজাত পণ্য

তামাক কোনো খাবার নয়, কিন্তু ক্যানসারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরোধযোগ্য ঝুঁকিগুলোর একটি। সিগারেট, বিড়ি, জর্দা, গুল, খৈনি ও অন্যান্য তামাকজাত পণ্য শরীরের বিভিন্ন অঙ্গের ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ায়।

WHO-এর সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, তামাক ব্যবহার ২০টিরও বেশি ধরনের ক্যানসারের ঝুঁকির সঙ্গে যুক্ত এবং শরীরের প্রায় সব অঙ্গকেই ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। তামাকের ধোঁয়ায় বহু কারসিনোজেনিক রাসায়নিক থাকে।

৮. দূষিত বা অনিরাপদ খাবার

খাদ্যের নিরাপত্তাও ক্যানসার প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ। কিছু খাবারে ছত্রাকের মাধ্যমে তৈরি আফ্লাটক্সিনের মতো দূষক থাকতে পারে, যা ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। WHO ক্যানসারের রাসায়নিক কারণগুলোর মধ্যে আফ্লাটক্সিনকে খাদ্যদূষক হিসেবে উল্লেখ করেছে।

তাই পচা, ছত্রাকযুক্ত বা সন্দেহজনকভাবে সংরক্ষিত খাবার না খাওয়া এবং খাদ্য নিরাপদভাবে সংরক্ষণ করা জরুরি।

ক্যানসারের ঝুঁকি কমাতে কী খাবেন?

ক্যানসার প্রতিরোধে কোনো একক ‘সুপারফুড’ নেই। বরং দীর্ঘমেয়াদে বৈচিত্র্যময় ও ভারসাম্যপূর্ণ খাদ্যাভ্যাস গুরুত্বপূর্ণ। WHO ফল, সবজি, ডাল, সম্পূর্ণ শস্য এবং স্বাস্থ্যকর প্রোটিনের বিভিন্ন উৎসকে খাদ্যতালিকায় রাখার পরামর্শ দেয়। একই সঙ্গে অতিরিক্ত লবণ, চিনি ও অস্বাস্থ্যকর চর্বিযুক্ত খাবার সীমিত করা উচিত।

প্রক্রিয়াজাত মাংস কম খাওয়া, অতিরিক্ত পোড়া খাবার এড়িয়ে চলা, ফাস্টফুডের পরিমাণ কমানো, পর্যাপ্ত শাকসবজি ও ফল খাওয়া এবং নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম করা স্বাস্থ্যকর অভ্যাসের অংশ হতে পারে। কোলোরেক্টাল ক্যানসারের ক্ষেত্রেও প্রক্রিয়াজাত মাংস, কম ফল-সবজি খাওয়া, শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা, স্থূলতা, ধূমপান ও অ্যালকোহলকে গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

শেষ কথা

ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ার পেছনে শুধু একটি খাবার দায়ী নয়। বয়স, বংশগত কারণ, তামাক, অ্যালকোহল, শরীরের ওজন, শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা, খাদ্যাভ্যাস এবং পরিবেশগত নানা বিষয় একসঙ্গে ভূমিকা রাখতে পারে। তাই কোনো নির্দিষ্ট খাবারকে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করার বদলে দীর্ঘমেয়াদে স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস গড়ে তোলা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

বিশেষ করে প্রক্রিয়াজাত মাংস ও অ্যালকোহল নিয়ে বৈজ্ঞানিক প্রমাণ তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী হলেও অ্যাক্রিলামাইড বা ট্রান্সফ্যাটের মতো কিছু বিষয়ে মানুষের ক্যানসারঝুঁকি নিয়ে প্রমাণ ভিন্ন মাত্রার। ফলে স্বাস্থ্যসংক্রান্ত তথ্য প্রচারের ক্ষেত্রে ‘এই খাবার খেলেই ক্যানসার হবে’ ধরনের দাবি এড়িয়ে প্রমাণের শক্তি ও সীমাবদ্ধতা দুটিই তুলে ধরা জরুরি।


Sources:


    Leave a Comment

    Your email address will not be published. Required fields are marked *

    Scroll to Top