মির্জা ফখমির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর হচ্ছেন পরবর্তী রাষ্ট্রপতি? মনোনয়ন প্রায় চূড়ান্ত, বিরোধী জোটের প্রার্থী অলি আহমদ

ঢাকা: বাংলাদেশের পরবর্তী রাষ্ট্রপতি হিসেবে বিএনপির মহাসচিব ও স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এর মনোনয়ন প্রায় চূড়ান্ত হয়েছে বলে জানিয়েছে বিএনপির একাধিক উচ্চপর্যায়ের সূত্র। দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান রাষ্ট্রপতি পদে মির্জা ফখরুলের নাম চূড়ান্ত করেছেন বলে দলীয় সূত্রের দাবি।
তবে বিএনপির পক্ষ থেকে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে প্রার্থীর নাম ঘোষণা করা হয়নি। নির্বাচন কমিশনের (ইসি) ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী, আগামী ১৩ আগস্ট রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়নপত্র দাখিল করা হবে। একাধিক প্রার্থী থাকলে ২০ আগস্ট জাতীয় সংসদে ভোট অনুষ্ঠিত হবে।
এদিকে বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের বিপরীতে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় বিরোধী জোট লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান ও বিএনপির সাবেক নেতা কর্নেল (অব.) অলি আহমদকে প্রার্থী ঘোষণা করেছে। ফলে এবার রাষ্ট্রপতি নির্বাচন দীর্ঘদিন পর সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতার দিকে এগোচ্ছে।
মির্জা ফখরুলের মনোনয়ন প্রায় নিশ্চিত
রাষ্ট্রপতি পদে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে প্রার্থী করার বিষয়ে বিএনপির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একাধিক নেতা প্রায় নিশ্চিত তথ্য দিয়েছেন। দলের জাতীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী মনোনয়নের দায়িত্ব দলীয় চেয়ারম্যান তারেক রহমানের ওপর দেওয়া হয়েছিল।
দলীয় সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, সেই দায়িত্বের ভিত্তিতেই তারেক রহমান মির্জা ফখরুলের নাম চূড়ান্ত করেছেন। রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় সম্মতিসূচক স্বাক্ষর বা লিখিত সম্মতিপত্রেও মির্জা ফখরুল ইতিমধ্যে সই করেছেন বলে সূত্রগুলো জানিয়েছে।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আইন অনুযায়ী, মনোনয়নপত্র দাখিলের সময় প্রার্থীর সম্মতি-সংক্রান্ত ঘোষণা বা লিখিত বিবৃতি জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক। একই সঙ্গে একজন সংসদ সদস্যকে প্রার্থীর নাম প্রস্তাব এবং আরেকজন সংসদ সদস্যকে তা সমর্থন করতে হয়।
ফলে মির্জা ফখরুলের পক্ষ থেকে সম্মতিপত্রে স্বাক্ষরের বিষয়টি তাঁর প্রার্থিতা চূড়ান্ত হওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের তফসিল
নির্বাচন কমিশনের ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়নপত্র দাখিল করা যাবে ১৩ আগস্ট সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত। মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই এবং প্রার্থিতা প্রত্যাহারের প্রক্রিয়া শেষে বৈধ প্রার্থী একাধিক থাকলে ২০ আগস্ট ভোট অনুষ্ঠিত হবে।
প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ সময় ১৮ আগস্ট।
সংবিধান ও রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আইন, ১৯৯১ অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হওয়ার ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন সম্পন্ন করতে হয়। সদ্য বিদায়ী রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ২৪ জুলাই পদত্যাগ করার পর রাষ্ট্রপতির পদটি শূন্য হয়। এরপর জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করছেন।
বিএনপির দুই মনোনয়নপত্র সংগ্রহ
রাষ্ট্রপতি নির্বাচন সামনে রেখে বিএনপি ইতিমধ্যে আনুষ্ঠানিক প্রস্তুতি শুরু করেছে। দলটির পক্ষ থেকে নির্বাচন কমিশন থেকে দুটি মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করা হয়েছে।
বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ও জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি এবং দলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী ইসি থেকে মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেন।
একই ব্যক্তির নামে একাধিক মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। ইসি সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, একই প্রার্থীর নামে একাধিক মনোনয়নপত্র দাখিল করা হলে যেকোনো একটি মনোনয়নপত্র বৈধ হলেই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বৈধ প্রার্থী হিসেবে বিবেচিত হবেন।
এর আগে সদ্য বিদায়ী রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের নির্বাচনের সময়ও তাঁর নামে দুটি মনোনয়নপত্র জমা দেওয়া হয়েছিল।
কেন মির্জা ফখরুলকে রাষ্ট্রপতি পদে আনা হচ্ছে
বিএনপির দীর্ঘদিনের মহাসচিব হিসেবে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দলের অভ্যন্তরে এবং জাতীয় রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান তৈরি করেছেন। ২০১১ সালে তিনি বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব পান। পরে ২০১৬ সালের জাতীয় কাউন্সিলে আনুষ্ঠানিকভাবে দলের মহাসচিব নির্বাচিত হন।
দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তিনি বিএনপির কঠিন সময়ের অন্যতম প্রধান সংগঠক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। খালেদা জিয়ার কারাবন্দিত্ব এবং তারেক রহমানের দেশের বাইরে অবস্থানের সময় দলীয় কর্মকাণ্ড পরিচালনায় তাঁর ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ।
আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে মির্জা ফখরুল একাধিকবার গ্রেপ্তার ও কারাবরণ করেন। প্রতিকূল রাজনৈতিক পরিস্থিতিতেও দলের সাংগঠনিক কার্যক্রম ও রাজনৈতিক কর্মসূচিতে নেতৃত্ব দিয়েছেন তিনি।
দলীয় রাজনীতির বাইরে জাতীয় পর্যায়েও মির্জা ফখরুল তুলনামূলকভাবে গ্রহণযোগ্য ও সংলাপমুখী নেতা হিসেবে পরিচিত। এসব কারণে রাষ্ট্রপতি পদে তাঁকে মনোনয়ন দেওয়ার সিদ্ধান্ত বিএনপির জন্য রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
মির্জা ফখরুল রাষ্ট্রপতি হলে বিএনপির মহাসচিব কে?
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হলে স্বাভাবিকভাবেই বিএনপির মহাসচিব পদটি শূন্য হবে। ফলে তাঁর উত্তরসূরি কে হবেন—এ নিয়ে দলের ভেতরে আলোচনা শুরু হয়েছে।
বিএনপির অভ্যন্তরীণ সূত্রে দুটি নাম বেশি আলোচনায় রয়েছে। তাঁরা হলেন দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ এবং দলের যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী।
দলের ভেতরে কেউ কেউ মনে করছেন, জাতীয় কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হওয়ার আগে বা কাউন্সিলকে সামনে রেখে একজনকে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব দেওয়া হতে পারে। পরে জাতীয় কাউন্সিল বা তার আশপাশের সময়ে মহাসচিব পদে স্থায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে।
রুহুল কবির রিজভী এবারের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেননি এবং তাঁকে মন্ত্রিসভাতেও রাখা হয়নি। এ কারণে মহাসচিব পদ শূন্য হলে তাঁকে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব করার সম্ভাবনা রয়েছে বলে দলের কয়েকজন দায়িত্বশীল নেতা মনে করছেন।
তবে বিএনপির পক্ষ থেকে এ বিষয়ে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত জানানো হয়নি।
রাষ্ট্রপতি পদে অলি আহমদকে প্রার্থী করল ১১-দলীয় জোট
মির্জা ফখরুলের সম্ভাব্য প্রার্থিতার বিপরীতে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় ঐক্য রাষ্ট্রপতি পদে কর্নেল (অব.) অলি আহমদের নাম ঘোষণা করেছে।
রোববার রাজধানীর মিন্টো রোডে বিরোধীদলীয় নেতার সরকারি বাসভবনে ১১-দলীয় জোটের শীর্ষ নেতাদের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠক শেষে বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম সাংবাদিকদের অলি আহমদকে রাষ্ট্রপতি প্রার্থী করার সিদ্ধান্তের কথা জানান।
অলি আহমদ বর্তমানে লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান। তিনি একসময় বিএনপির গুরুত্বপূর্ণ নেতা ছিলেন।
বিরোধী জোটের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক করার পাশাপাশি রাজনৈতিক সংস্কার ও জুলাই সনদের বিষয়ে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করতেই তারা আলাদা প্রার্থী দিয়েছে।
কেন আলাদা প্রার্থী দিল বিরোধী জোট?
নাহিদ ইসলামের বক্তব্য অনুযায়ী, জুলাই সনদ ও রাষ্ট্র সংস্কারের প্রশ্নে বিএনপি প্রত্যাশিত উদ্যোগ নেয়নি। বিরোধী জোটের নেতারা মনে করেন, রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সংস্কার ও ঐকমত্যের ভিত্তিতে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের উদ্যোগ নেওয়া হলে একক প্রার্থী দেওয়া সম্ভব হতো।
কিন্তু বিএনপি সেই পথে না যাওয়ায় ১১-দলীয় জোট নিজেদের পক্ষ থেকে আলাদা প্রার্থী দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
জোটের নেতারা রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে জয়-পরাজয়ের হিসাবের পাশাপাশি এটিকে রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রতিদ্বন্দ্বিতা হিসেবে দেখছেন। তাঁদের মতে, সংসদে বিরোধী দলের উপস্থিতি ও সক্রিয় ভূমিকা দৃশ্যমান করার জন্য এই নির্বাচন একটি সুযোগ।
অলি আহমদের বক্তব্য
রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী হিসেবে মনোনীত হওয়ার পর অলি আহমদ ১১-দলীয় জোটের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
তিনি নিজেকে একজন মুক্তিযোদ্ধা ও পরীক্ষিত রাজনৈতিক নেতা হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, তাঁর বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ নেই এবং তাঁর শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়েও কোনো প্রশ্ন নেই। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি পদে তাঁকে মনোনয়ন দেওয়ার মাধ্যমে বিরোধী জোট জনগণের সামনে একটি রাজনৈতিক বার্তা দিতে চায়।
অলি আহমদের প্রার্থিতা জাতীয় রাজনীতিতে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে তিনি বিএনপির সাবেক শীর্ষ নেতা হওয়ায় তাঁর প্রার্থিতাকে বিএনপি ও বিরোধী জোটের মধ্যকার রাজনৈতিক দূরত্বের একটি প্রতীক হিসেবেও দেখছেন অনেকে।
জামায়াতের রাজনৈতিক বার্তা
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে অলি আহমদকে প্রার্থী করার সিদ্ধান্তকে জামায়াতের নেতারা একটি রাজনৈতিক বার্তা হিসেবে দেখছেন।
দলটির নেতাদের বক্তব্য, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনসহ সব ধরনের রাজনৈতিক প্রক্রিয়াকে প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক করা প্রয়োজন। নিশ্চিত পরাজয়ের সম্ভাবনা থাকলেও নির্বাচন থেকে বিরত না থেকে অংশগ্রহণের মাধ্যমে বিরোধী দলের কার্যকর ভূমিকা তুলে ধরতে চান তাঁরা।
জামায়াতে ইসলামীর আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান বলেছেন, সব ক্ষেত্রে রাজনীতি স্বচ্ছ ও প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক হওয়া উচিত। এর মাধ্যমে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া আরও শক্তিশালী হবে বলে তিনি মনে করেন।
দলের নায়েবে আমির সৈয়দ আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহেরও রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া শক্তিশালী করার অংশ হিসেবে দেখেছেন।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচন কীভাবে হবে?
বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি সরাসরি জনগণের ভোটে নির্বাচিত হন না। জাতীয় সংসদ সদস্যদের ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রতিটি সংসদ সদস্য একটি করে ভোট দিতে পারেন। ভোট অনুষ্ঠিত হলে নির্বাচন কমিশন প্রয়োজনীয় ব্যালট পেপার প্রস্তুত করে। ব্যালটে রাষ্ট্রপতি পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী প্রার্থীদের নাম নির্দিষ্ট নিয়মে উল্লেখ থাকে।
ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে সংসদ সদস্যকে নির্ধারিত নিয়ম অনুসরণ করতে হয়। ভোট গ্রহণের দায়িত্ব পালন করেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার বা তাঁর নির্ধারিত কর্তৃপক্ষ।
সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদের কারণে সংসদে দলীয় অবস্থানের বাইরে ভোট দেওয়ার সুযোগ কার্যত সীমিত। কোনো সংসদ সদস্য নিজ দলের বিরুদ্ধে ভোট দিলে তাঁর সংসদ সদস্য পদ শূন্য হওয়ার সাংবিধানিক বিধান রয়েছে।
১৯৯১ সালের পর এবারই বড় প্রতিদ্বন্দ্বিতা
১৯৯১ সালে সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রবর্তনের পর রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে সরাসরি ভোটাভুটি হয়েছে মাত্র একবার।
১৯৯১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি ১৪০টি আসন এবং আওয়ামী লীগ ৮৮টি আসন পেয়েছিল। জামায়াতে ইসলামীর সমর্থনে বিএনপি সরকার গঠন করে। ওই সময় আওয়ামী লীগ রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী দিয়েছিল।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী আবদুর রহমান বিশ্বাস ১৭২ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন।
এরপর বিভিন্ন সময়ে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বিরোধী দল প্রার্থী না দেওয়ায় ভোটাভুটির প্রয়োজন হয়নি। সাধারণত সংসদে ক্ষমতাসীন দলের সংখ্যাগরিষ্ঠতার কারণে রাষ্ট্রপতি পদে বিরোধী প্রার্থী দেওয়ার রাজনৈতিক আগ্রহও দেখা যায়নি।
এবারের পরিস্থিতি সেই দিক থেকে আলাদা। সংসদে বিএনপির দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকা সত্ত্বেও বিরোধী জোট রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী দিয়েছে।
২০ আগস্ট সংসদে ভোট হওয়ার সম্ভাবনা
রাষ্ট্রপতি পদে অলি আহমদ প্রার্থী হওয়ায় এবার ভোটাভুটির সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। একাধিক প্রার্থী চূড়ান্তভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় থাকলে ২০ আগস্ট জাতীয় সংসদে ভোট অনুষ্ঠিত হবে।
ইতিমধ্যে নির্বাচন কমিশন ভোটের প্রস্তুতি শুরু করেছে। তফসিল ঘোষণার সময় ৩৪৯ জন ভোটারের তালিকাও প্রকাশ করা হয়েছে।
শুরুতে ইসির ধারণা ছিল, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী না থাকায় ভোটাভুটির প্রয়োজন নাও হতে পারে। কিন্তু বিরোধী জোট প্রার্থী ঘোষণা করায় এখন ব্যালট ছাপানো, ভোটকেন্দ্র ও ভোট ব্যবস্থাপনাসহ প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিতে হচ্ছে।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচন উপলক্ষে জাতীয় সংসদের নিয়মিত অধিবেশন চলমান থাকা বাধ্যতামূলক নয়। প্রয়োজন হলে স্পিকারের সঙ্গে আলোচনা করে নির্বাচন কমিশন ভোটের দিন সংসদ সদস্যদের বৈঠক আহ্বানের ব্যবস্থা করতে পারে। ওই বৈঠকে সভাপতিত্ব করবেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচন ঘিরে নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ
এবারের রাষ্ট্রপতি নির্বাচন কেবল একজন নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের সাংবিধানিক প্রক্রিয়া নয়; এর সঙ্গে বিএনপির অভ্যন্তরীণ রাজনীতি এবং দেশের বৃহত্তর রাজনৈতিক সমীকরণও জড়িয়ে আছে।
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হলে বিএনপির মহাসচিব পদে তাঁর উত্তরসূরি নির্ধারণ দলের জন্য বড় সিদ্ধান্ত হয়ে উঠবে। ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব হিসেবে কে দায়িত্ব পাবেন এবং পরবর্তী জাতীয় কাউন্সিলে কার নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হবে—এসব প্রশ্নও সামনে আসবে।
অন্যদিকে অলি আহমদের প্রার্থিতা বিরোধী রাজনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতার হিসাব বিএনপির পক্ষে থাকলেও বিরোধী জোট নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান স্পষ্ট করেছে।
সব মিলিয়ে, ২০ আগস্টের রাষ্ট্রপতি নির্বাচন বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক বাস্তবতায় বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে। একদিকে মির্জা ফখরুলের সম্ভাব্য রাষ্ট্রপতি হওয়া বিএনপির নেতৃত্ব কাঠামোয় পরিবর্তন আনতে পারে, অন্যদিকে অলি আহমদের প্রার্থিতা সংসদীয় রাজনীতিতে বিরোধী দলের সক্রিয় ভূমিকার নতুন দৃষ্টান্ত তৈরি করতে পারে।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের চূড়ান্ত ফলাফল যাই হোক, এই নির্বাচনকে ঘিরে বিএনপির নেতৃত্বে পরিবর্তন, বিরোধী জোটের কৌশল এবং ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক সমীকরণ—তিনটি বিষয়ই আগামী দিনে বাংলাদেশের রাজনীতির আলোচনার কেন্দ্রে থাকবে।



