ওবায়দুল কাদের সহ সাত আসামির সর্বোচ্চ শাস্তি চাইল প্রসিকিউশন
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় যুক্তিতর্ক শেষ; সব আসামির ব্যক্তিগত ও ‘সুপিরিয়র কমান্ড রেসপনসিবিলিটি’ রয়েছে বলে দাবি চিফ প্রসিকিউটরের

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে দায়ের করা মামলায় আওয়ামী লীগের (কার্যক্রম নিষিদ্ধ) সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের সহ সাত আসামির সর্বোচ্চ শাস্তি চেয়েছে রাষ্ট্রপক্ষ। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এ মামলাটির যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের ষষ্ঠ দিনে বুধবার (১২ আগস্ট) প্রসিকিউশনের পক্ষে যুক্তিতর্কের সমাপনী বক্তব্যে চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম এ শাস্তি প্রার্থনা করেন।
চিফ প্রসিকিউটর তাঁর বক্তব্যে বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত অপরাধের জন্য মামলার সব আসামির ব্যক্তিগত দায় রয়েছে। একই সঙ্গে তাঁদের প্রত্যেকের বিরুদ্ধে ‘সুপিরিয়র কমান্ড রেসপনসিবিলিটি’ বা অধীনস্থদের অপরাধ ঠেকাতে ব্যর্থতার দায়ও প্রযোজ্য বলে দাবি করেন তিনি।
ওবায়দুল কাদেরের বিরুদ্ধে নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগ
রাষ্ট্রপক্ষের যুক্তিতর্কে ওবায়দুল কাদের ভূমিকা বিশেষভাবে তুলে ধরা হয়। চিফ প্রসিকিউটর বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত সহিংসতা ও অপরাধ ঠেকাতে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে ওবায়দুল কাদের কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেননি। বরং প্রসিকিউশনের দাবি অনুযায়ী, তিনি আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে প্রাণঘাতী ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন।
আমিনুল ইসলাম ট্রাইব্যুনালকে বলেন, ওবায়দুল কাদের জেনেশুনেই এ ধরনের নির্দেশনা দিয়েছেন এবং এমন নির্দেশের সম্ভাব্য পরিণতি সম্পর্কেও তিনি অবগত ছিলেন। রাষ্ট্রপক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, তাঁর অবস্থান ও রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে এসব নির্দেশনা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ওপর প্রভাব পড়েছিল।
তবে এসব বক্তব্য রাষ্ট্রপক্ষের উপস্থাপিত অভিযোগ ও যুক্তিতর্কের অংশ। মামলার চূড়ান্ত রায়ে ট্রাইব্যুনাল সাক্ষ্য-প্রমাণ ও উভয় পক্ষের বক্তব্য মূল্যায়ন করে অভিযোগগুলোর বিষয়ে সিদ্ধান্ত দেবেন।
সাত আসামির বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ
এই মামলায় ওবায়দুল কাদের ছাড়া আরও ছয়জন আসামি রয়েছেন। তাঁরা হলেন আওয়ামী লীগের (কার্যক্রম নিষিদ্ধ) যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, সাবেক তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত, যুবলীগের (কার্যক্রম নিষিদ্ধ) চেয়ারম্যান শেখ ফজলে শামস পরশ, সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান, নিষিদ্ধঘোষিত ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি সাদ্দাম হোসেন এবং সাধারণ সম্পাদক শেখ ওয়ালী আসিফ।
রাষ্ট্রপক্ষের বক্তব্য অনুযায়ী, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের সঙ্গে এই সাত আসামির প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে। প্রসিকিউশন দাবি করেছে, তাঁদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো সাক্ষ্য-প্রমাণের মাধ্যমে প্রমাণ করা সম্ভব হয়েছে।
মামলার সব আসামিই বর্তমানে পলাতক বলে আদালতে জানানো হয়েছে।
হাজারো মানুষ নিহত ও আহত হওয়ার দাবি
যুক্তিতর্কে চিফ প্রসিকিউটর জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় হতাহত মানুষের সংখ্যার বিষয়টিও তুলে ধরেন। তাঁর দাবি, ওই সময় সংঘটিত অপরাধের কারণে হাজারো মানুষ নিহত হয়েছেন এবং প্রায় ৩৫ হাজার মানুষ গুরুতরভাবে আহত হয়েছেন।
রাষ্ট্রপক্ষের বক্তব্য অনুযায়ী, এসব ঘটনা বিচ্ছিন্ন কোনো অপরাধ ছিল না; বরং একটি বৃহত্তর পরিকল্পনা, নির্দেশনা ও সাংগঠনিক কাঠামোর সঙ্গে এর সম্পর্ক ছিল। এ কারণেই মামলার আসামিদের ব্যক্তিগত দায়ের পাশাপাশি ‘সুপিরিয়র কমান্ড রেসপনসিবিলিটি’র বিষয়টিও সামনে আনা হয়েছে বলে জানান চিফ প্রসিকিউটর।
তিনি বলেন, ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা ব্যক্তিরা তাঁদের রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক প্রভাব ব্যবহার করে সহিংসতা বন্ধে উদ্যোগ নিতে পারতেন। কিন্তু রাষ্ট্রপক্ষের অভিযোগ অনুযায়ী, তাঁরা তা করেননি। বরং কোনো কোনো ক্ষেত্রে সহিংসতাকে উৎসাহিত বা নির্দেশিত করার মতো ভূমিকা পালন করেছেন।
‘দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি’ চায় রাষ্ট্রপক্ষ
প্রসিকিউশনের সমাপনী বক্তব্যে আসামিদের অপরাধকে অত্যন্ত গুরুতর হিসেবে বর্ণনা করা হয়। চিফ প্রসিকিউটর বলেন, মামলায় যেসব অভিযোগ আনা হয়েছে, রাষ্ট্রপক্ষ সেগুলো প্রমাণ করতে পেরেছে। ফলে আসামিদের প্রত্যেকের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হওয়া উচিত।
তিনি আরও বলেন, গুরুতর অপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত এসব আসামি কোনো ধরনের অনুকম্পা পাওয়ার যোগ্য নন। তাঁদের সর্বোচ্চ শাস্তি দেওয়ার জন্য ট্রাইব্যুনালের কাছে আবেদন জানান তিনি।
চিফ প্রসিকিউটর তাঁর বক্তব্যে আরও বলেন, ভবিষ্যতে জনগণের ম্যান্ডেট বা রাজনৈতিক ক্ষমতার দোহাই দিয়ে যাতে কেউ একই ধরনের কর্মকাণ্ড চালাতে না পারেন, সে জন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করা প্রয়োজন। তাঁর ভাষায়, ওবায়দুল কাদেরদের মতো রাজনীতিবিদদের জন্ম যাতে এ দেশে আর না হয়, সেই বার্তাও আদালতের রায়ের মাধ্যমে স্পষ্ট হওয়া উচিত।
প্রসিকিউশনের যুক্তিতর্ক শেষ
ছয় দিন ধরে চলা যুক্তিতর্কের মাধ্যমে এই মামলায় রাষ্ট্রপক্ষের বক্তব্য শেষ হলো। এখন মামলার পরবর্তী ধাপে আসামিপক্ষের আইনজীবীরা তাঁদের যুক্তি উপস্থাপনের সুযোগ পাবেন। এরপর উভয় পক্ষের বক্তব্য ও উপস্থাপিত সাক্ষ্য-প্রমাণ পর্যালোচনা করে ট্রাইব্যুনাল মামলাটির বিষয়ে সিদ্ধান্ত দেবেন।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন মামলাগুলোতে অভিযোগ প্রমাণের ক্ষেত্রে সাক্ষ্য, নথিপত্র ও অন্যান্য উপাদান আদালতের সামনে উপস্থাপন করা হয়। রাষ্ট্রপক্ষ কোনো আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ আনলেই তা চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত হয়েছে—এমনটি ধরে নেওয়া যায় না। বিচারিক প্রক্রিয়ার শেষ পর্যায়ে ট্রাইব্যুনালের রায়ের মাধ্যমেই অভিযোগগুলোর আইনগত অবস্থান নির্ধারিত হবে।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে দায়ের করা এই মামলা তাই রাজনৈতিক ও আইনগত—দুই দিক থেকেই গুরুত্বপূর্ণ। একদিকে রাষ্ট্রপক্ষ সাত আসামির সর্বোচ্চ শাস্তি দাবি করেছে, অন্যদিকে মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তির জন্য এখন ট্রাইব্যুনালের সামনে আসামিপক্ষের বক্তব্য এবং পরবর্তী বিচারিক প্রক্রিয়া গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।



