হবিগঞ্জে হামলার ঘটনায় মামলা চেয়ে পুলিশের কাছে লিখিত অভিযোগ এনসিপির, গ্রেপ্তারের দাবিতে নাহিদ ইসলামের কড়া বার্তা
হবিগঞ্জে এনসিপি নেতাদের গাড়িবহরে হামলা ও নেতা-কর্মীদের মারধরের ঘটনায় বাহুবলের কামাইছড়া পুলিশ ফাঁড়িতে একটি অভিযোগ দায়ের করেছেন দলটির নেতারা। বুধবার রাত ৯টার দিকের ছবি: প্রথম আলো

হবিগঞ্জ: জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতা-কর্মীদের ওপর হামলা ও মারধরের ঘটনায় পুলিশের কাছে লিখিত অভিযোগ জমা দিয়েছে দলটি। অভিযোগে নির্দিষ্ট কয়েকজনের নাম উল্লেখের পাশাপাশি অজ্ঞাতনামা আরও প্রায় ১০০ জনকে আসামি করা হয়েছে। এখন অভিযোগটি মামলা হিসেবে গ্রহণ করে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয় কি না, সেদিকেই নজর রাখছেন এনসিপির নেতারা।

বুধবার রাতে হবিগঞ্জের বাহুবল উপজেলার কামাইছড়া পুলিশ ফাঁড়িতে দলের চারজন কেন্দ্রীয় নেতা উপস্থিত হয়ে লিখিত অভিযোগ জমা দেন। বাহুবল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ রুহুল আমিন তালুকদার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, এনসিপির নেতারা মঙ্গলবার সংঘটিত হামলার ঘটনায় পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে অভিযোগ দিয়েছেন এবং পরে সেখান থেকে চলে যান। বর্তমানে এলাকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

হামলার ঘটনার পর মামলা দায়েরের উদ্যোগ

পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, লিখিত অভিযোগে বাদী করা হয়েছে হবিগঞ্জ জেলা যুবশক্তির আহ্বায়ক তন্ময় তারেক রুবেলকে। অভিযোগটি পরবর্তীতে হবিগঞ্জ সদর মডেল থানায় মামলা হিসেবে গ্রহণের প্রক্রিয়ায় রয়েছে। এতে ১১ জনের নাম উল্লেখ করে আসামি করা হয়েছে। পাশাপাশি অজ্ঞাতপরিচয় আরও প্রায় ১০০ জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। তবে তাৎক্ষণিকভাবে নাম উল্লেখ করা ব্যক্তিদের পরিচয় প্রকাশ করা হয়নি।

অভিযোগ জমা দেওয়ার সময় উপস্থিত ছিলেন এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম, মুখ্য সংগঠক (উত্তরাঞ্চল) সারজিস আলম, মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী এবং মুখ্য সংগঠক (দক্ষিণাঞ্চল) হাসনাত আবদুল্লাহ।

কী ঘটেছিল হবিগঞ্জে?

মঙ্গলবার বিকেলে হবিগঞ্জে এনসিপির ঘোষিত ‘জুলাই পদযাত্রা’ কর্মসূচি শেষ হওয়ার পর দলের কেন্দ্রীয় নেতাদের গাড়িবহরে হামলার ঘটনা ঘটে। অভিযোগ অনুযায়ী, হামলাকারীরা নেতা-কর্মীদের মারধর করে এবং পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।

এরপর সন্ধ্যায় হবিগঞ্জ শহরে প্রতিবাদ মিছিল বের করলে আবারও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এই ঘটনার জেরে এনসিপি বিক্ষোভ সমাবেশের ঘোষণা দেয়। অন্যদিকে হবিগঞ্জ বিএনপি ও ছাত্রদলও পাল্টা কর্মসূচির ঘোষণা দিলে দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা আরও বাড়ে।

উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সম্ভাব্য সংঘর্ষ এড়াতে জেলা প্রশাসন শহরের নির্দিষ্ট এলাকায় ফৌজদারি কার্যবিধির ১৪৪ ধারা জারি করে, যাতে জনসমাগম ও রাজনৈতিক কর্মসূচির ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়।

prothomalo bangla 2026 07 29 5a4u962e 7ff91924 5c4c 42b8 9777 bbf21376dec6
হবিগঞ্জের ঢাকা–সিলেট মহাসড়কের বাহুবলের কামাইছড়া এলাকায় এনসিপির নেতাদের বাধা দেয় পুলিশ। বুধবার সন্ধ্যায়
ছবি: প্রথম আলো

পুলিশের বাধা পেরিয়ে অভিযোগ জমা

১৪৪ ধারা জারির পরও এনসিপির কেন্দ্রীয় নেতারা হবিগঞ্জের উদ্দেশে রওনা দেন। তবে পথে একাধিকবার পুলিশের বাধার মুখে পড়েন বলে অভিযোগ করেন তারা।

বুধবার বিকেলে মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলার সাতগাঁও এলাকায় চা–কন্যা ভাস্কর্যের সামনে ঢাকা–সিলেট আঞ্চলিক মহাসড়কে এনসিপির গাড়িবহর থামিয়ে দেওয়া হয়। দলটির নেতারা অভিযোগ করেন, পুলিশ তাদের সামনে এগোতে নিরুৎসাহিত করে এবং নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে আটকে রাখে।

এ সময় নেতা-কর্মীরা মহাসড়কে অবস্থান নেন। প্রায় এক ঘণ্টা পুলিশের সঙ্গে আলোচনা ও বাগ্‌বিতণ্ডার পর বিকেল পাঁচটার দিকে তারা পুনরায় যাত্রা শুরু করেন। তবে শেষ পর্যন্ত হবিগঞ্জ শহরে প্রবেশ না করে বাহুবলের কামাইছড়া পুলিশ ফাঁড়িতে গিয়ে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন।

নাহিদ ইসলামের বক্তব্য

অভিযোগ জমা দেওয়ার পর সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেন, পুলিশ যদি সত্যিকার অর্থে তাদের নিরপেক্ষতা প্রমাণ করতে চায় এবং অতীতের রাজনৈতিক পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ থেকে বেরিয়ে আসতে চায়, তাহলে হামলার ঘটনায় দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, অভিযুক্তদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে বিচার নিশ্চিত করা হলে জনগণের মধ্যে আইনের শাসনের প্রতি আস্থা বাড়বে। অন্যথায় বিচারহীনতার সংস্কৃতি অব্যাহত থাকার আশঙ্কা তৈরি হবে।

এ সময় তিনি সরকারের বিভিন্ন নীতিগত বিষয় নিয়েও সমালোচনা করেন। তার দাবি, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতা নিশ্চিত না হলে গণতান্ত্রিক পরিবেশ আরও দুর্বল হতে পারে।

prothomalo bangla 2026 07 29 de5c87f7 1b57b4b2 ea87 4983 b920 332b4c777995 1
পুলিশ ফাঁড়িতে অভিযোগ দায়ের শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলছেন এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম
ছবি: প্রথম আলো

মহাসড়কের যান চলাচল স্বাভাবিক

অভিযোগ দায়ের এবং সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার পর রাত সাড়ে আটটার দিকে এনসিপির নেতা-কর্মীরা মহাসড়ক ছেড়ে দেন। এরপর ঢাকা–সিলেট মহাসড়কে সৃষ্টি হওয়া দীর্ঘ যানজট ধীরে ধীরে কমতে শুরু করে এবং যান চলাচল স্বাভাবিক হয়।

পরবর্তীতে নাহিদ ইসলাম, সারজিস আলমসহ দলের কেন্দ্রীয় নেতারা মৌলভীবাজারের উদ্দেশে রওনা হন।

এখন নজর পুলিশের পদক্ষেপে

হামলার ঘটনায় দায়ের করা লিখিত অভিযোগটি মামলা হিসেবে নথিভুক্ত হয় কি না এবং অভিযোগে উল্লেখিত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয় কি না—এখন সেটিই রাজনৈতিক অঙ্গন এবং সংশ্লিষ্টদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে।

এদিকে পুরো ঘটনার পর হবিগঞ্জের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে রয়েছে প্রশাসন। রাজনৈতিক কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে নতুন করে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।


Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top