নবাবগঞ্জে মশালমিছিল নিয়ে মামলা, আওয়ামী লীগের ১১৪ জনের সঙ্গে জামায়াতের ৫ কর্মী আসামি
দিনাজপুরের নবাবগঞ্জে শেখ হাসিনার ফাঁসির রায় প্রত্যাহারের দাবিতে মশালমিছিলের প্রস্তুতি ও নাশকতার চেষ্টার অভিযোগে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা করেছে পুলিশ। মামলায় সাবেক সংসদ সদস্য শিবলী সাদিকসহ ১১৪ জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়া অজ্ঞাতনামা আরও ৭০ থেকে ৮০ জনকে আসামি করা হয়েছে।

দিনাজপুরের নবাবগঞ্জে মশালমিছিলের প্রস্তুতি ও নাশকতার চেষ্টার অভিযোগে আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা করেছে পুলিশ। মামলায় দিনাজপুর-৬ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য এবং নবাবগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি শিবলী সাদিকসহ ১১৪ জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে।
একই মামলায় জামায়াতে ইসলামীর পাঁচ সক্রিয় কর্মীকে আসামি করা হয়েছে বলে দাবি করেছে দলটির স্থানীয় নেতৃত্ব। তাঁদের বিরুদ্ধে করা মামলাকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও মিথ্যা মামলা হিসেবে দাবি করেছেন জামায়াতের নেতারা।
সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা
রোববার রাতে নবাবগঞ্জ থানার উপপরিদর্শক (এসআই) গোলাম মোস্তফা বাদী হয়ে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলাটি করেন। মামলায় ১১৪ জনের নাম উল্লেখের পাশাপাশি অজ্ঞাতনামা আরও ৭০ থেকে ৮০ জনকে আসামি করা হয়েছে।
পুলিশের এজাহার অনুযায়ী, ৯ আগস্ট রাত ৯টার দিকে নবাবগঞ্জ উপজেলার বিনোদনগর পাহাড়পুর এলাকায় পাঠানগঞ্জ-ডাংশেরহাট পাকা সড়কের ওপর কয়েকজন ব্যক্তি জড়ো হন। তাঁদের সেখানে সমবেত হওয়ার পেছনে সাবেক সংসদ সদস্য শিবলী সাদিকের নির্দেশনা ছিল বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।
পুলিশের অভিযোগ, সেখানে শেখ হাসিনার ফাঁসির রায় প্রত্যাহারের দাবিতে মশালমিছিল করার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছিল। এ সময় তাঁদের কাছে পশুকুড়াল, লোহার বড, সামুরাই, হকিস্টিক ও বাঁশের লাঠিসহ বিভিন্ন ধরনের দেশীয় অস্ত্র ছিল বলেও মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।
পুলিশের অভিযানে দুজন আটক
পুলিশ জানায়, ঘটনাটি সম্পর্কে তথ্য পাওয়ার পর রাত সোয়া ১০টার দিকে ওই এলাকায় অভিযান চালানো হয়। পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে সেখানে জড়ো হওয়া ব্যক্তিরা পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন।
এ সময় ঘটনাস্থল থেকে রাজ ইসলাম (২২) ও মাসুদ রানা (২১) নামে দুজনকে আটক করা হয়। পরে তাঁদের ওই মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়।
নবাবগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবদুল কুদ্দুস জানান, আটক দুজনকে মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে সোমবার দুপুরে দিনাজপুর আদালতে পাঠানো হয়েছে। মামলার অন্য আসামিদের গ্রেপ্তারে পুলিশ অভিযান চালাচ্ছে বলেও জানান তিনি।
মামলায় যাঁদের নাম রয়েছে
মামলার উল্লেখযোগ্য আসামিদের মধ্যে রয়েছেন দিনাজপুর-৬ (নবাবগঞ্জ, বিরামপুর, হাকিমপুর ও ঘোড়াঘাট) আসনের সাবেক সংসদ সদস্য এবং কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নবাবগঞ্জ উপজেলা শাখার সভাপতি শিবলী সাদিক (৪৪)।
এ ছাড়া মামলায় নবাবগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শাহ মো. জিয়াউর রহমান ওরফে মানিক (৫২), উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক তাজওয়ার মোহাম্মদ ফাহিম ওরফে নাইনটি (৩৭), যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সায়েম সবুজ (৪৭) এবং সানোয়ার হোসেন মণ্ডল (৫৮)-এর নাম রয়েছে।
এ ছাড়া কার্যক্রম নিষিদ্ধ স্বেচ্ছাসেবক লীগের নবাবগঞ্জ উপজেলা শাখার আহ্বায়ক আবুল বাসার (৩৪), নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের উপজেলা কমিটির সাবেক সভাপতি শাহিনুর রহমান, সাধারণ সম্পাদক শামীম হোসেন ও সাবেক সাধারণ সম্পাদক রাসেল মিয়া (৩৪)সহ আরও অনেকে মামলার আসামি হয়েছেন।
জামায়াতের পাঁচ কর্মীকে আসামি করার দাবি
মামলায় জামায়াতে ইসলামীর পাঁচ সক্রিয় কর্মীকে আসামি করা হয়েছে বলে দাবি করেছেন দলটির নেতারা। তাঁদের অভিযোগ, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে তাঁদের মামলায় জড়ানো হয়েছে।
জামায়াতের কেন্দ্রীয় মজলিসে শুরা সদস্য ও দিনাজপুর জেলা শাখার সাবেক আমির আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, মামলার এজাহারে ২১ নম্বর আসামি হিসেবে পুঁটিমারা গ্রামের হারুন অর রশিদ, ২২ নম্বর আসামি হিসেবে তাঁর ছেলে মো. রোকনুজ্জামান, ৯৩ নম্বর আসামি হিসেবে তাঁর জামাতা মোস্তফা কামাল নওশাদ এবং ভাদুরিয়া গ্রামের আবদুস সাত্তার ও রফিকুল ইসলামের নাম রয়েছে।
আনোয়ারুল ইসলামের দাবি, তাঁরা জামায়াতের সক্রিয় কর্মী। আগামী দিনে জামায়াতের মিছিল-সমাবেশে অংশ নেওয়া থেকে কর্মীদের বিরত রাখতে এবং তাঁদের মধ্যে ভীতি সৃষ্টি করতে একটি রাজনৈতিক দলের ইন্ধনে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে তাঁদের মামলায় আসামি করা হয়েছে।
তবে জামায়াতের এই অভিযোগের বিষয়ে পুলিশের পক্ষ থেকে আলাদাভাবে কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
মশালমিছিলের প্রস্তুতির অভিযোগ
মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, ৯ আগস্ট রাত ৯টার দিকে বিনোদনগর পাহাড়পুর এলাকায় পাকা সড়কের ওপর আসামিরা সমবেত হন। সেখানে শেখ হাসিনার ফাঁসির রায় প্রত্যাহারের দাবিতে মশালমিছিল করার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছিল বলে পুলিশের অভিযোগ।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, ঘটনাস্থলে থাকা ব্যক্তিদের কাছে দেশীয় অস্ত্র ও লাঠিসোঁটা ছিল। পুলিশ অভিযান চালানোর পর উপস্থিত ব্যক্তিরা পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। এ সময় দুজনকে আটক করা সম্ভব হয়।
তবে মামলার এজাহারে থাকা অভিযোগগুলোর সত্যতা আদালতে প্রমাণিত হওয়ার আগে আসামিদের দোষী হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই। মামলার তদন্তের মাধ্যমে ঘটনার প্রকৃত পরিস্থিতি এবং প্রত্যেক আসামির সংশ্লিষ্টতা যাচাই করা হবে।
অন্য আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান
নবাবগঞ্জ থানার ওসি আবদুল কুদ্দুস জানিয়েছেন, মামলায় গ্রেপ্তার হওয়া দুই আসামিকে সোমবার দুপুরে দিনাজপুর আদালতে পাঠানো হয়েছে। মামলার অন্য আসামিদের গ্রেপ্তারের জন্য পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
এদিকে, মামলায় বিপুলসংখ্যক ব্যক্তিকে আসামি করা এবং জামায়াতের পাঁচ কর্মীর নাম অন্তর্ভুক্ত হওয়ার ঘটনায় স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা তৈরি হয়েছে। জামায়াতের পক্ষ থেকে মামলাটিকে রাজনৈতিকভাবে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত দাবি করা হলেও পুলিশ মামলাটি করেছে এজাহারে বর্ণিত অভিযোগের ভিত্তিতে।
বর্তমানে মামলাটির তদন্ত চলছে। তদন্তে ঘটনাস্থলে কারা উপস্থিত ছিলেন, মশালমিছিলের প্রস্তুতির সঙ্গে কারা জড়িত ছিলেন এবং নাশকতার কোনো পরিকল্পনা ছিল কি না—এসব বিষয় খতিয়ে দেখবে পুলিশ। একই সঙ্গে মামলায় নাম থাকা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের সত্যতা ও তাঁদের প্রত্যেকের ভূমিকা তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারণ করা হবে।
তদন্তের পর পরিষ্কার হবে ঘটনার প্রকৃত চিত্র
নবাবগঞ্জে মশালমিছিলের প্রস্তুতিকে কেন্দ্র করে করা এই মামলায় আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের পাশাপাশি জামায়াতের পাঁচ কর্মীর নাম আসায় বিষয়টি রাজনৈতিকভাবেও গুরুত্ব পেয়েছে।
পুলিশ বলছে, মামলার তদন্ত অনুযায়ী পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অন্যদিকে জামায়াতের স্থানীয় নেতারা তাঁদের কর্মীদের বিরুদ্ধে করা অভিযোগ প্রত্যাহার এবং ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।
মামলার পরবর্তী কার্যক্রম, তদন্তের অগ্রগতি এবং আদালতের সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়েই অভিযোগগুলোর বিষয়ে আরও স্পষ্ট তথ্য পাওয়া যাবে।



