ইরানের সঙ্গে ব্যবসা করা দেশগুলোকেও ভয়াবহ অর্থনৈতিক শাস্তির হুমকি ট্রাম্পের

ইরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ আরও বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ইরানকে সহায়তা করা কিংবা দেশটির সঙ্গে ব্যবসা চালিয়ে যাওয়া যেকোনো দেশের বিরুদ্ধে কঠোর অর্থনৈতিক ব্যবস্থা নেওয়ার হুমকি দিয়েছেন তিনি। তবে কী ধরনের শাস্তি দেওয়া হবে, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো ঘোষণা দেননি মার্কিন প্রেসিডেন্ট।
ইরান যুদ্ধ ছয় মাসে গড়ানোর প্রেক্ষাপটে ওয়াশিংটনের নতুন এই উদ্যোগ সামনে এলো। যুদ্ধ বন্ধে কূটনৈতিক তৎপরতা অব্যাহত থাকলেও এখন পর্যন্ত স্থায়ী সমাধানের কোনো পথ বের হয়নি। একই সময়ে গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক নৌপথ হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাপকভাবে বাধাগ্রস্ত হওয়ায় বৈশ্বিক বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহ নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে।
ইরানের অর্থনীতিকে বিচ্ছিন্ন করার উদ্যোগ
গত বুধবার দেওয়া এক বক্তব্য ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত পোস্টে ট্রাম্প বলেন, যেসব দেশ ইরানকে কোনো ধরনের সহায়তা দেবে, তাদের গুরুতর অর্থনৈতিক পরিণতির মুখোমুখি হতে হবে।
তিনি বলেন, কোনো দেশের আর্থিক প্রতিষ্ঠান, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, বিমানবন্দর কিংবা সরকারি সংস্থা যদি ইরানকে সহায়তা করার সুযোগ দেয়, তাহলে ওই দেশকে ‘ভয়াবহ অর্থনৈতিক পরিণতি’ মোকাবিলা করতে হবে।
ট্রাম্পের ঘোষণায় ইরানের সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্পর্ক থাকা দেশগুলোর ওপরও চাপ বাড়ার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। বিশেষ করে ইরানের সঙ্গে আর্থিক লেনদেন, জ্বালানি বাণিজ্য, পরিবহন কিংবা অন্যান্য অর্থনৈতিক কার্যক্রমে যুক্ত প্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্রগুলো নতুন মার্কিন নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
তবে মার্কিন প্রেসিডেন্টের বক্তব্যে সম্ভাব্য শাস্তির ধরন, সময়সীমা বা কোন কোন দেশকে লক্ষ্য করা হবে—এসব বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি।
‘অপারেশন ইকোনমিক ফিউরি’ জোরদারের প্রস্তুতি
ইরানের অর্থনীতিকে দুর্বল করতে যুক্তরাষ্ট্র কয়েক মাস ধরে ‘অপারেশন ইকোনমিক ফিউরি’ নামে একটি নিষেধাজ্ঞাভিত্তিক অভিযান চালিয়ে আসছে। এই অভিযানের আওতায় ইরানের অর্থায়নের পথ বন্ধ করতে বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হচ্ছে।
মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্টও গত সপ্তাহে জানিয়েছিলেন, ইরানকে অর্থনৈতিকভাবে বিচ্ছিন্ন করার প্রচেষ্টা আরও জোরদার করা হবে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ইরানের ওপর সামরিক চাপের পাশাপাশি অর্থনৈতিক চাপ বাড়ানো হবে, যাতে তেহরানের আর্থিক সক্ষমতা সীমিত করা যায়।
ট্রাম্পের সর্বশেষ ঘোষণাকে সেই বৃহত্তর কৌশলেরই অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। ওয়াশিংটনের লক্ষ্য হচ্ছে ইরানের অর্থনীতির ওপর এমন চাপ তৈরি করা, যাতে দেশটির সরকার সামরিক কর্মকাণ্ড চালানো এবং আঞ্চলিক প্রভাব বজায় রাখার ক্ষেত্রে আরও বেশি সমস্যায় পড়ে।
ট্রাম্পের দাবি, ইরান চুক্তির সুযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে
ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প ইরানকে তাঁর প্রশাসনের সঙ্গে সমঝোতায় পৌঁছানোর সুযোগ প্রত্যাখ্যান করার জন্য দায়ী করেন।
ট্রাম্প দাবি করেন, তাঁর প্রশাসন ইরানকে চুক্তিতে পৌঁছানোর জন্য বড় ধরনের সুযোগ দিয়েছিল। কিন্তু তেহরান সেই সুযোগ কাজে লাগায়নি।
একই পোস্টে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ইরানের সামরিক সক্ষমতা নিয়েও একাধিক দাবি করেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ইরানের নৌবাহিনী ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, বিমানবাহিনীকে ধ্বংস করা হয়েছে এবং সামরিক স্থাপনাগুলোও বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছে। একই সঙ্গে ইরানের মুদ্রার মূল্যও ব্যাপকভাবে কমে গেছে বলে দাবি করেন তিনি।
তবে এসব দাবির স্বাধীন যাচাই করা হয়নি।
মিত্রদের ইরান বিচ্ছিন্ন করার আহ্বান
ইরানকে আন্তর্জাতিকভাবে আরও বিচ্ছিন্ন করতে মার্কিন মিত্রদের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন ট্রাম্প। তিনি তাঁর পরিকল্পনাকে ‘ইকোনমিক ডি-ডে’ বা অর্থনৈতিক চূড়ান্ত অভিযানের সঙ্গে তুলনা করেছেন।
ট্রাম্পের বক্তব্য অনুযায়ী, ইরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ বাড়ালে দেশটির অর্থনৈতিক সক্ষমতা দুর্বল হবে এবং বিশ্বজুড়ে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে তেহরানের কথিত সহায়তার ক্ষমতাও কমে আসবে।
তবে ওয়াশিংটনের এই নীতির ফলে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলোর ওপরও অর্থনৈতিক চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। কারণ, ইরানের সঙ্গে বাণিজ্যিক ও জ্বালানি সম্পর্ক থাকা দেশগুলোকে এখন যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা নীতি এবং নিজেদের অর্থনৈতিক স্বার্থের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে হতে পারে।
কূটনীতির বিষয়ে পরস্পরবিরোধী বার্তা
ইরান যুদ্ধের অবসান নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষ থেকে সাম্প্রতিক সময়ে কূটনীতি ও সামরিক চাপ—দুই ধরনের বার্তাই দেওয়া হয়েছে। একদিকে আলোচনার সম্ভাবনার কথা বলা হচ্ছে, অন্যদিকে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক ও অর্থনৈতিক চাপ আরও বাড়ানোর ঘোষণা আসছে।
তেহরানও জানিয়েছে, তারা কূটনীতির দরজা পুরোপুরি বন্ধ করেনি। তবে ইরানের অবস্থান হলো, কোনো দুর্বল অবস্থান থেকে আলোচনা করা হবে না।
ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান বলেছেন, আলোচনা মানে আত্মসমর্পণ নয়। অর্থাৎ কূটনৈতিক সমাধানের সম্ভাবনা থাকলেও তেহরান চাপের মুখে নিজেদের অবস্থান পরিবর্তন করতে প্রস্তুত নয়।
ট্রাম্পের হুমকির তীব্র প্রতিবাদ ইরানের
মার্কিন প্রেসিডেন্টের নতুন অর্থনৈতিক হুমকির তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে ইরানের রাষ্ট্রীয় ও রাষ্ট্রীয় ঘনিষ্ঠ সংবাদমাধ্যমগুলো। তাদের বক্তব্য, ইরানের ওপর চাপ বাড়ানোর এই ঘোষণা মূলত তেহরানকে অবস্থান পরিবর্তনে বাধ্য করার পুরোনো কৌশলেরই সম্প্রসারিত রূপ।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি ট্রাম্পের কথিত ‘ইকোনমিক ডি-ডে’কে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক সমস্যা থেকে মানুষের দৃষ্টি সরানোর কৌশল হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। তাঁর মতে, যুক্তরাষ্ট্রের বিপুল ঋণ এবং সুদের ব্যয় বাড়ার বিষয়টি আড়াল করতেই ওয়াশিংটন ইরানকে কেন্দ্র করে নতুন করে চাপ তৈরির চেষ্টা করছে।
ইরানের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী গরিবাবাদিও মার্কিন নীতির সমালোচনা করেছেন। তিনি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র যে অর্থনৈতিক যুদ্ধের কথা বলছে, সেটিও শেষ পর্যন্ত ব্যর্থতায় পর্যবসিত হবে।
তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, সামরিক অভিযানে কাঙ্ক্ষিত ফল না পাওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র এখন অর্থনৈতিক যুদ্ধকে পরবর্তী কৌশল হিসেবে সামনে এনেছে। ইরানি কর্মকর্তার দাবি, ওয়াশিংটনের ভুল হিসাব-নিকাশই একের পর এক নতুন সংকট তৈরি করছে।
সামনে আরও কঠিন অর্থনৈতিক চাপের আশঙ্কা
ট্রাম্পের সর্বশেষ ঘোষণা থেকে স্পষ্ট যে ইরানের বিরুদ্ধে শুধু সরাসরি নিষেধাজ্ঞা নয়, দেশটির সঙ্গে ব্যবসা করা তৃতীয় দেশগুলোর ওপরও চাপ বাড়াতে চায় যুক্তরাষ্ট্র। এর ফলে ইরানের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক থাকা দেশগুলোর জন্য নতুন অর্থনৈতিক ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
বিশেষ করে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল বাধাগ্রস্ত থাকার কারণে জ্বালানি ও বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থার ওপর যে চাপ তৈরি হয়েছে, তার মধ্যে নতুন অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করতে পারে।
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে কূটনৈতিক সমাধানের পথ এখনো পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। কিন্তু উভয় পক্ষের কঠোর অবস্থান এবং ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক চাপের কারণে সমঝোতায় পৌঁছানো কতটা সম্ভব হবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা থেকেই যাচ্ছে।
ট্রাম্প প্রশাসন যদি ইরানের সঙ্গে ব্যবসা করা তৃতীয় দেশগুলোর বিরুদ্ধেও ব্যাপক নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করে, তাহলে এই সংঘাতের প্রভাব শুধু যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। বরং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, জ্বালানি বাজার এবং যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলোর অর্থনীতিতেও এর প্রভাব পড়তে পারে।



