হুতিদের ড্রোন হামলা ঘিরে উত্তেজনা, সৌদির পাল্টা হুঁশিয়ারি

ছবি: এএফপি
মক্কা: পবিত্র মক্কা নগরী লক্ষ্য করে ইয়েমেনের হুতিরা ড্রোন ছুড়েছিল বলে দাবি করেছে সৌদি আরব। দেশটির দাবি, ড্রোনটি সৌদি আকাশসীমায় প্রবেশের আগেই মক্কার দক্ষিণে ভূপাতিত করা হয়। এ ঘটনায় হুতিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে রিয়াদ।
গত মঙ্গলবার সন্ধ্যায় ড্রোনটি মক্কা লক্ষ্য করে ছোড়া হয়েছিল বলে জানিয়েছেন ইয়েমেনে সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোটের মুখপাত্র তুর্কি আল-মালকি। বুধবার এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, ড্রোনটি মক্কার সংরক্ষিত এলাকায় প্রবেশের আগেই প্রতিহত করা হয়েছে।
সৌদি কর্তৃপক্ষের দাবি, পবিত্র মক্কা ও অন্যান্য ধর্মীয় স্থানের নিরাপত্তার ক্ষেত্রে কোনো ধরনের হুমকি বরদাশত করা হবে না। হুতিদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিতে জোট দ্বিধা করবে না বলেও সতর্ক করেন আল-মালকি।
তবে সৌদি আরবের এই দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে হুতিরা। গোষ্ঠীটির পলিটব্যুরোর সদস্য হাজেম আল-আসাদ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে বলেন, মক্কাকে লক্ষ্য করে হামলার অভিযোগ ‘মিথ্যার পুনরাবৃত্তি’। তার দাবি, এ ধরনের অভিযোগ দিয়ে এখন আর মানুষকে বিভ্রান্ত করা যায় না।
মক্কা, তাইফ ও জেদ্দায় নিরাপত্তা সতর্কতা
হুতিদের হামলার আশঙ্কায় মঙ্গলবার মক্কার পাশাপাশি তাইফ ও জেদ্দাতেও নিরাপত্তা সতর্কতা জারি করেছিল সৌদি কর্তৃপক্ষ। পরে অবশ্য সেই সতর্কতা প্রত্যাহার করা হয়।
সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে ঘটনাটিকে ‘সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড’ হিসেবে উল্লেখ করে মক্কার মসজিদুল হারাম, মদিনার মসজিদে নববি, তীর্থযাত্রী এবং সৌদি ভূখণ্ডের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার অধিকার থাকার কথা জানিয়েছে।
২০১৭ সালের জুলাইয়েও মক্কা লক্ষ্য করে হুতিদের একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের অভিযোগ উঠেছিল। সৌদি আরব তখনও ক্ষেপণাস্ত্রটি প্রতিহত করার দাবি করেছিল।
সৌদি যুদ্ধবিমান ভূপাতিতের দাবি হুতিদের
এদিকে ইয়েমেনের মারিব এলাকায় সৌদি আরবের একটি এফ-১৫ যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করার দাবি করেছে হুতিরা। গোষ্ঠীটির সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি বলেন, স্থানীয়ভাবে তৈরি ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য একটি ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে যুদ্ধবিমানটি ভূপাতিত করা হয়েছে।
স্থানীয় সূত্রের বরাতে আল-জাজিরা জানিয়েছে, মারিবের উত্তর-পশ্চিমে হেলান পর্বতের কাছে যুদ্ধবিমানটি ভূপাতিত করা হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। তবে এ বিষয়ে সৌদি আরবের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
হুতিদের আরও দাবি, সাম্প্রতিক দিনগুলোতে ইয়েমেনে তাদের অবস্থান লক্ষ্য করে সৌদি বাহিনী প্রায় ৪৫০টি বিমান হামলা চালিয়েছে। সৌদি-সমর্থিত ইয়েমেন সরকারের কর্মকর্তারা তাদের বাহিনী ও সৌদি আরবের বিমান হামলার কথা স্বীকার করলেও সৌদি কর্তৃপক্ষ এখন পর্যন্ত হুতিদের অবস্থানে বিমান হামলার বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানায়নি।
মক্কা হামলার নিন্দা বাংলাদেশের
মক্কা লক্ষ্য করে ড্রোন হামলার অভিযোগের ঘটনায় তীব্র নিন্দা জানিয়েছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে মক্কা আল-মুকাররমার পবিত্রতা এবং সৌদি আরবের অন্যান্য পবিত্র স্থানের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা পুনর্ব্যক্ত করেছে।
বিবৃতিতে পবিত্র স্থানগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে সৌদি আরব ও দেশটির জনগণের প্রতি বাংলাদেশের সংহতির কথাও জানানো হয়।
বাংলাদেশের পাশাপাশি ইসলামি সহযোগিতা সংস্থা (ওআইসি), আরব লিগ, জর্ডান, কুয়েত, মালয়েশিয়া, পাকিস্তান ও ভারতও ঘটনাটির নিন্দা জানিয়েছে।
হুতিদের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের গোপন বৈঠকের দাবি
এদিকে হুতিদের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তাদের গোপন বৈঠকের খবরও সামনে এসেছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে পাঁচটি সূত্রের বরাতে বলা হয়েছে, গত রোববার ওমানের রাজধানী মাসকাটে হুতি প্রতিনিধিদের সঙ্গে মার্কিন কর্মকর্তাদের বৈঠক হয়েছে। বৈঠক আয়োজনে ওমান সরকার সহযোগিতা করেছে বলে জানিয়েছে দুটি সূত্র।
সূত্রগুলোর দাবি, বৈঠকে হুতিরা মার্কিন জাহাজে হামলা না করার এবং ২০২৫ সালের যুদ্ধবিরতি মেনে চলার বিষয়ে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। একটি সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, ইসরায়েলি বা সৌদি মালিকানাধীন জাহাজ ছাড়া অন্য বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা না চালানোর বিষয়েও আলোচনা হয়েছে।
তবে এই বৈঠক ও সংশ্লিষ্ট প্রতিশ্রুতির বিষয়ে হুতিদের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি।
ইয়েমেনে নতুন করে সংঘাত বাড়ছে
২০১৪ সালে ইয়েমেনের রাজধানী সানা দখলের মাধ্যমে হুতিদের উত্থান নতুন পর্যায়ে পৌঁছায়। পরের বছর, ২০১৫ সালের মার্চে, ইয়েমেন সরকারকে সমর্থন দিতে সৌদি আরবের নেতৃত্বে একটি সামরিক জোট দেশটিতে অভিযান শুরু করে।
২০২২ সালে যুদ্ধবিরতির পর ইয়েমেনে সংঘাতের মাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে এলেও সাম্প্রতিক সময়ে পরিস্থিতি আবার উত্তপ্ত হয়েছে। পশ্চিমাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় সরকারি বাহিনী ও হুতিদের মধ্যে নতুন করে সংঘর্ষের খবর পাওয়া যাচ্ছে।
আল-জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মারিব প্রদেশের পূর্ব আল-বালাকসহ কয়েকটি এলাকায় দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ হয়েছে। ইয়েমেনের সরকারি বাহিনীর দাবি, তারা হুতিদের হামলা প্রতিহত করছে। তায়েজ প্রদেশের দক্ষিণাঞ্চলেও হুতিদের হামলা ঠেকানোর দাবি করেছে সরকারি বাহিনী।
এ ছাড়া বাব আল-মানদেব প্রণালির কাছাকাছি কাহবুব পর্বতমালার দিকে হুতিরা অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করছে বলে সরকারি পক্ষ দাবি করেছে।
বাস্তুচ্যুত এক লাখের বেশি মানুষ
নতুন করে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ায় ইয়েমেনে মানবিক পরিস্থিতিও আরও সংকটপূর্ণ হয়ে উঠেছে। জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআরের তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক সংঘাতের পর দেশটির ভেতরে এক লাখের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে।
এ ছাড়া দুই হাজারের বেশি মানুষ নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে বাব আল-মানদেব প্রণালি পাড়ি দিয়ে লোহিত সাগরের পশ্চিম তীরের দেশ জিবুতিতে আশ্রয় নিয়েছে বলে সংস্থাটির তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক বিশ্লেষক লরেঞ্জো কামেল আল-জাজিরাকে বলেছেন, হুতিদের কেবল ইরানের ‘প্রক্সি’ হিসেবে দেখলে তাদের ভূমিকা পুরোপুরি বোঝা যায় না। তার মতে, আঞ্চলিক অস্থিরতাকে কাজে লাগিয়ে হুতিরা নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থ ও অভ্যন্তরীণ কর্তৃত্ব জোরদারের পাশাপাশি সৌদি আরবের হস্তক্ষেপ বন্ধে চাপ সৃষ্টি করছে।
ইয়েমেনে সামরিক উত্তেজনা, সৌদি আরবের নিরাপত্তা উদ্বেগ এবং লোহিত সাগরকেন্দ্রিক সংঘাত—সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে।



