হরমুজ প্রণালি নিয়ন্ত্রণে ইরানের কঠোর অবস্থান, জ্বালানি তেলের দাম নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে উদ্বেগ

ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের মধ্যে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে উত্তেজনা আরও বেড়েছে। ইরান জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের কোনো সামরিক নির্দেশ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্ট কিংবা রাজনৈতিক বক্তব্যের মাধ্যমে এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথের নিয়ন্ত্রণ নেওয়া সম্ভব নয়। তেহরান একই সঙ্গে যুদ্ধ বন্ধ এবং পরিস্থিতির বাস্তবতা মেনে নিতে ওয়াশিংটনের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে।
ইরানের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম গরিবাবাদি শনিবার ভোরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে বলেন, হরমুজ প্রণালি ইরানের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী খোলা বা বন্ধ হবে। তাঁর ভাষ্য, যুক্তরাষ্ট্র যতক্ষণ পর্যন্ত পরাজয়ের বাস্তবতা মেনে না নেবে এবং ‘অবাস্তব কল্পনা’ থেকে সরে না আসবে, ততক্ষণ হরমুজ প্রণালিতে ইরানের অবরোধ বহাল থাকবে।
তিনি আরও বলেন, একটি টুইট, বিমানবাহী রণতরী, সামরিক নির্দেশ কিংবা নির্বাচনী বক্তৃতার মাধ্যমে হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নেওয়া যায় না।
শান্তি আলোচনা নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের অবসানে শান্তি আলোচনা নিয়ে অগ্রগতির খবর পাওয়া গেলেও এখনো কোনো চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছানোর স্পষ্ট লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। বরং হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল প্রায় অচল হয়ে পড়ায় আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা পুনরায় শুরু করার বিষয়ে তেহরান এখনো কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি। শনিবার প্রকাশিত এক সাক্ষাৎকারে তিনি ইরানের সংবাদমাধ্যম শাহরারা নিউজকে বলেন, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করতে হলে যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানের নির্ধারিত কিছু শর্ত মেনে নিতে হবে।
তেহরানের এই অবস্থান থেকে স্পষ্ট, হরমুজ প্রণালিকে ইরান কেবল একটি নৌপথ হিসেবে নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্রের ওপর কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগের একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হিসেবেও বিবেচনা করছে।
বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহে হরমুজের গুরুত্ব
হরমুজ প্রণালি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ। সংঘাত শুরুর আগে বিশ্বের মোট জ্বালানি তেল সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই জলপথ দিয়ে পরিবহন করা হতো। ফলে প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে তেল সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
বিশেষ করে এশিয়ার বিভিন্ন দেশ হরমুজ প্রণালির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। মধ্যপ্রাচ্যের তেল উৎপাদনকারী দেশগুলো থেকে এশিয়া, ইউরোপসহ বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে অপরিশোধিত তেল ও জ্বালানি পরিবহনে এই জলপথ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
হরমুজ প্রণালিতে দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থা তৈরি হলে সরবরাহ ব্যবস্থায় চাপ বাড়তে পারে। এর প্রভাব অপরিশোধিত তেলের আন্তর্জাতিক মূল্য থেকে শুরু করে পরিবহন ব্যয়, শিল্প উৎপাদন এবং ভোক্তা পর্যায়ের জ্বালানি মূল্যে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রে পেট্রোলের দাম বেড়েছে
ইরান সংঘাতের প্রভাব ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি বাজারেও দৃশ্যমান হয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প শুক্রবার নিউইয়র্কের গার্ডেন সিটিতে এক রাজনৈতিক সমাবেশে আমেরিকানদের পেট্রোলের জন্য আরও কিছুটা বেশি দাম দেওয়ার জন্য প্রস্তুত থাকার আহ্বান জানান।
ট্রাম্প ইরানকে কঠোর ভাষায় সমালোচনা করে বলেন, একটি দেশকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে বিরত রাখার বিনিময়ে পেট্রোলের জন্য কিছুটা বেশি অর্থ ব্যয় করা গ্রহণযোগ্য। ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরতে তিনি এই বিষয়টিকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে উপস্থাপন করেন।
আমেরিকান অটোমোবাইল অ্যাসোসিয়েশনের (এএএ) তথ্য অনুযায়ী, শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্রে এক গ্যালন পেট্রোলের গড় মূল্য ছিল প্রায় ৪ দশমিক ০৮ ডলার। এক বছর আগের তুলনায় এই দাম প্রায় ২৯ শতাংশ বেশি।
ট্রাম্প তাঁর দ্বিতীয় মেয়াদের নির্বাচনী প্রচারে যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানি ও পেট্রোলের দাম কমানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। কিন্তু ইরানের সঙ্গে সংঘাতের পর জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা বাড়ায় সেই প্রতিশ্রুতি এখন রাজনৈতিকভাবে নতুন চাপের মুখে পড়তে পারে।
মূল্যস্ফীতি নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ
যুক্তরাষ্ট্রে পেট্রোলের দাম বৃদ্ধির প্রভাব শুধু গাড়িচালকদের ব্যয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকার আশঙ্কা নেই। জ্বালানি পরিবহন ও উৎপাদনের প্রায় প্রতিটি পর্যায়ের সঙ্গে যুক্ত থাকায় তেলের দাম বাড়লে খাদ্য, পণ্য পরিবহন, শিল্প উৎপাদনসহ বিভিন্ন খাতে ব্যয় বাড়তে পারে।
এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রে মূল্যস্ফীতির চাপ আরও তীব্র হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। সাধারণ ভোক্তাদের মধ্যে জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে অসন্তোষ বাড়লে তা রাজনৈতিকভাবেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
আগামী নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ইরান যুদ্ধের অর্থনৈতিক প্রভাব ইতোমধ্যে মার্কিন রাজনীতিতে আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে। ডেমোক্র্যাটরা জ্বালানি মূল্য বৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতির চাপ এবং যুদ্ধের ব্যয়কে ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক ইস্যু হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করছে।
ইরানের অর্থনীতিতেও যুদ্ধের চাপ
অন্যদিকে হরমুজ প্রণালি নিয়ন্ত্রণে ইরানের কঠোর অবস্থানের কারণে দেশটির অর্থনীতিও চাপের মুখে পড়েছে। দীর্ঘদিনের নিষেধাজ্ঞা ও যুদ্ধ পরিস্থিতির সঙ্গে নতুন করে বন্দর অবরোধ এবং তেল রপ্তানিতে বাধা যুক্ত হওয়ায় অর্থনৈতিক সংকট আরও গভীর হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেওয়া বক্তব্যে দেশটির উচ্চ মূল্যস্ফীতির জন্য যুক্তরাষ্ট্রের আরোপ করা বন্দর অবরোধ এবং ইরানের তেল রপ্তানির ওপর নিষেধাজ্ঞাকে দায়ী করেছেন।
তেহরানের বক্তব্য অনুযায়ী, যুদ্ধ ও নিষেধাজ্ঞার কারণে আমদানি-রপ্তানি, সরবরাহব্যবস্থা এবং বৈদেশিক বাণিজ্যে বাধা তৈরি হয়েছে। এর প্রভাব অভ্যন্তরীণ বাজারে পণ্য ও জ্বালানির দামের ওপরও পড়ছে।
সামনে কী হতে পারে
হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান এখনো বিপরীতমুখী। ওয়াশিংটন সামরিক চাপ অব্যাহত রাখার পাশাপাশি তেহরানকে পারমাণবিক সক্ষমতা সীমিত করার জন্য চাপ দিচ্ছে। অন্যদিকে ইরান সামরিক ও অর্থনৈতিক চাপের মধ্যে নিজেদের শর্তে যুদ্ধের অবসান এবং হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার অবস্থান নিয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে কূটনৈতিক সমঝোতা না হলে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের সংকট আরও দীর্ঘায়িত হতে পারে। তার সঙ্গে আন্তর্জাতিক তেলের বাজারে সরবরাহ সংকট এবং মূল্যবৃদ্ধির ঝুঁকিও বাড়বে।
বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথ কত দ্রুত স্বাভাবিক হবে, তার ওপর শুধু মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতিই নয়, যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অর্থনৈতিক চাপও অনেকাংশে নির্ভর করছে। ফলে হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের পরবর্তী সিদ্ধান্ত আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার ও বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।



