ফেসবুক লাইভে কান্নায় ভেঙে পড়লেন অভিনেত্রী জ্যোতিকা জ্যোতি, কাজ না পাওয়া ও মানসিক চাপে থাকার দাবি

ঢাকা: অভিনেত্রী জ্যোতিকা জ্যোতি দীর্ঘদিন ধরে অভিনয় থেকে দূরে রয়েছেন। তাঁর দাবি, গত প্রায় দুই বছর ধরে তিনি উল্লেখযোগ্য কোনো কাজ পাচ্ছেন না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিয়মিত ট্রল, ব্যক্তিগত আক্রমণ এবং পেশাগতভাবে একঘরে করে রাখার অভিযোগ তুলে সোমবার (৪ আগস্ট) সন্ধ্যায় ফেসবুক লাইভে এসে কান্নায় ভেঙে পড়েন এই অভিনেত্রী। লাইভে তিনি নিজের মানসিক অবস্থা, পেশাগত অনিশ্চয়তা এবং আর্থিক সংকটের কথাও তুলে ধরেন।
লাইভে আবেগাপ্লুত কণ্ঠে জ্যোতিকা জ্যোতি বলেন, তিনি নিজেকে সম্পূর্ণ অসহায় অনুভব করছেন। তাঁর অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে পরিকল্পিতভাবে তাঁকে অভিনয়ের কাজ থেকে দূরে রাখা হচ্ছে এবং বিভিন্ন জায়গায় তাঁকে কার্যত ‘ব্ল্যাকলিস্ট’ করা হয়েছে। তবে এই অভিযোগের পক্ষে তিনি নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের নাম উল্লেখ করেননি।
কাজ না পাওয়ার অভিযোগ
ফেসবুক লাইভে জ্যোতিকা দাবি করেন, দীর্ঘ সময় ধরে নতুন কোনো নাটক, চলচ্চিত্র বা অন্যান্য অভিনয় প্রকল্পে কাজের সুযোগ পাচ্ছেন না। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, বিভিন্ন গ্রুপিং ও প্রভাবশালী মহলের কারণে অনেকেই তাঁকে নিয়ে কাজ করতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না।
তিনি বলেন, অনেক নির্মাতা ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ব্যক্তিগতভাবে তাঁকে জানিয়েছেন যে তাঁকে নিয়ে কাজ করতে তাঁরা ভয় পান। ফলে অভিনয়জীবন কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে বলে দাবি করেন এই অভিনেত্রী।
জ্যোতির ভাষায়, তিনি কখনো কারও কাছে গিয়ে কাজ চাইতে অভ্যস্ত নন এবং নিজের নীতির সঙ্গে আপস করেও কাজ করতে চান না। এ কারণে বর্তমান পরিস্থিতি তাঁর জন্য আরও কঠিন হয়ে উঠেছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
মানসিক চাপ ও আর্থিক সংকটের কথা
লাইভে জ্যোতিকা জ্যোতি জানান, দীর্ঘদিনের মানসিক চাপ তাঁর ব্যক্তিগত জীবনেও গভীর প্রভাব ফেলেছে। তিনি দাবি করেন, অনলাইন হয়রানি, কটূক্তি এবং ব্যক্তিগত আক্রমণের কারণে তিনি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন।
তিনি আরও বলেন, দীর্ঘ সময় কাজ না থাকায় আর্থিক সংকটও তৈরি হয়েছে। অনেক সময় তাঁকে বাবা-মায়ের কাছ থেকে আর্থিক সহায়তা নিতে হচ্ছে, যা তাঁর জন্য মানসিকভাবে আরও কষ্টের বলে উল্লেখ করেন।
লাইভের একপর্যায়ে আবেগাপ্লুত হয়ে তিনি বলেন, “আমি হেল্পলেস। আমার আর শক্তি নেই। আমার মনে হচ্ছে, আমি আর ঘুরে দাঁড়াতে পারব না।”

রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে আলোচনার প্রেক্ষাপট
জ্যোতিকা জ্যোতির রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে গত কয়েক বছর ধরে বিভিন্ন সময়ে আলোচনা হয়েছে। তিনি বহুল আলোচিত ‘আলো আসবেই’ নামের একটি হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপের সদস্য ছিলেন বলে আগে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। পাশাপাশি আওয়ামী লীগ-সমর্থক শিল্পী হিসেবে পরিচিত থাকায় ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর তিনি নানা প্রতিকূল পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছেন বলে দাবি করে আসছেন।
ফেসবুক লাইভেও তিনি বলেন, ২০২৪ সালের পর থেকে তাঁর বিরুদ্ধে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপপ্রচার, ব্যক্তিগত আক্রমণ এবং বিভিন্ন ধরনের হয়রানি বেড়ে যায়। তাঁর দাবি, রাজনৈতিক ও আদর্শিক অবস্থানের কারণেই একাধিক পক্ষের সমালোচনা, অনলাইন বুলিং এবং হুমকির মুখে পড়তে হয়েছে।
এ ছাড়া তাঁর বিরুদ্ধে মামলাও হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর কোনো বক্তব্য তিনি লাইভে তুলে ধরেননি।
শিল্পকলা একাডেমির ঘটনার প্রসঙ্গ
লাইভে জ্যোতিকা জ্যোতি গত বছরের একটি আলোচিত ঘটনার কথাও স্মরণ করেন। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে তিনি বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির গবেষণা বিভাগের পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। সে সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ে যে তাঁকে অফিসকক্ষে আটকে রাখা হয়েছে।
পরে তিনি ফেসবুক লাইভে এসে নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, চলমান পরিস্থিতির কারণে তাঁকে অফিসে যেতে নিরুৎসাহিত করা হয়েছিল। এরপরও দায়িত্ববোধ থেকে অফিসে গেলে উত্তেজনাপূর্ণ পরিবেশের মুখোমুখি হন।
তিনি জানান, অফিস ত্যাগের সময় বাইরে উপস্থিত লোকজনের সঙ্গে কথা বলতে চাইলেও কেউ তাঁর সঙ্গে কথা বলতে রাজি হননি। সে অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, আগে পরিচিত অনেক মুখই সেদিন তাঁর কাছে সম্পূর্ণ অপরিচিত মনে হয়েছিল।
সরকারের প্রতি আবেদন
সাম্প্রতিক ফেসবুক লাইভে বর্তমান সরকারের প্রতি পরিস্থিতির অবসান ঘটানোর আহ্বান জানান জ্যোতিকা জ্যোতি। তাঁর ভাষ্য, দীর্ঘদিন ধরে চলমান অনিশ্চয়তা ও মানসিক চাপের একটি সমাধান প্রয়োজন।
লাইভের একপর্যায়ে আবেগঘন কণ্ঠে তিনি বলেন, “এই বাংলাদেশে জন্ম নিয়েই ভুল করেছি।” একই সঙ্গে তিনি সরকারের প্রতি অনুরোধ জানিয়ে বলেন, “এর একটা শেষ করেন, প্লিজ।”
এ সময় তিনি আরও দাবি করেন, দীর্ঘদিনের মানসিক চাপের কারণে তাঁর শারীরিক অবস্থারও অবনতি হয়েছে।
অভিনয়জীবনের পথচলা
জ্যোতিকা জ্যোতি ২০০৪ সালে একটি সুন্দরী প্রতিযোগিতার মাধ্যমে বিনোদন অঙ্গনে যাত্রা শুরু করেন। ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী এই অভিনেত্রী টেলিভিশন নাটকের পাশাপাশি দেশের চলচ্চিত্রেও উল্লেখযোগ্য কাজ করেছেন।
তিনি অভিনয় করেছেন ‘আয়না’, ‘নন্দিত নরকে’, ‘জীবনঢুলি’, ‘অনিল বাগচীর একদিন’, ‘মায়া: দ্য লস্ট মাদার’, ‘লাল মোরগের ঝুঁটি’ এবং কলকাতার ‘রাজলক্ষ্মী ও শ্রীকান্ত’-সহ একাধিক আলোচিত চলচ্চিত্রে।
বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ও নাট্যাঙ্গনে দীর্ঘ সময় কাজ করা এই অভিনেত্রীর সাম্প্রতিক ফেসবুক লাইভ ইতোমধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। তাঁর উত্থাপিত অভিযোগগুলোর বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া গেলে তা সংযুক্ত করলে ঘটনাটির পূর্ণাঙ্গ চিত্র আরও স্পষ্ট হবে।



