হামাস নেতাদের সঙ্গে কুশনারের বৈঠক, গাজা শান্তি পরিকল্পনায় নতুন তৎপরতা

ছবি: রয়টার্স
ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় যুদ্ধবিরতি ও শান্তি প্রতিষ্ঠায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবিত পরিকল্পনা এগিয়ে নিতে হামাসের নেতাদের সঙ্গে মিসরে বৈঠক করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা ও মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক দূত জ্যারেড কুশনার। যুক্তরাষ্ট্র হামাসকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে তালিকাভুক্ত করে রাখলেও গাজায় যুদ্ধ বন্ধের প্রচেষ্টায় ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে সংগঠনটির সরাসরি যোগাযোগ সাম্প্রতিক সময়ে বেড়েছে।
রোববার ফিলিস্তিনি একটি সূত্র আল-জাজিরাকে জানায়, মিসরের আলামেইন শহরে কুশনারের সঙ্গে হামাসের নেতাদের বৈঠক হয়েছে। বৈঠকে গাজায় যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের অভিযোগ এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবিত শান্তি পরিকল্পনা বাস্তবায়নের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা হয়। বৈঠকে কুশনার স্পষ্ট করে বলেছেন, গাজার বাসিন্দাদের অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার কোনো পরিকল্পনাকে যুক্তরাষ্ট্র সমর্থন করে না।
বৈঠক সম্পর্কে অবগত আরেক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ট্রাম্পের প্রস্তাবিত পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য কী কী পদক্ষেপ নিতে হবে এবং সেসব পদক্ষেপ কীভাবে যাচাই করা হবে, তা নিয়েও আলোচনা হয়েছে। আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর মধ্যে ছিল গাজায় যুদ্ধবিরতি বজায় রাখা এবং উপত্যকাটির প্রশাসনিক দায়িত্ব ধীরে ধীরে গাজার জন্য গঠিত জাতীয় কমিটির কাছে হস্তান্তর করা।
গাজা পরিচালনায় হামাসের ভূমিকা না রাখার প্রস্তাব
আলোচনায় গাজার ভবিষ্যৎ প্রশাসন নিয়েও বিস্তারিত কথা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, গাজার প্রশাসনিক ব্যবস্থায় ভবিষ্যতে হামাসের কোনো ভূমিকা থাকবে না। একই সঙ্গে হামাসকে গাজার শাসনক্ষমতা এবং অস্ত্র ও সামরিক অবকাঠামো ছেড়ে দেওয়ার বিষয়টিও পরিকল্পনার অংশ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
প্রস্তাবিত কাঠামোর লক্ষ্য হলো গাজাকে এমন একটি রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাব্যবস্থার আওতায় আনা, যাতে ভবিষ্যতে উপত্যকাটি ইসরায়েলের জন্য কোনো ধরনের ‘সন্ত্রাসের’ উৎস না হয়। তবে এসব শর্ত বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া এবং হামাসের অবস্থান নিয়ে এখনো বড় ধরনের মতপার্থক্য রয়েছে।
বৈঠকে হামাসের রাজনৈতিক নেতা খলিল আল-হায়া উপস্থিত ছিলেন। মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বৈঠকে মিসরের গোয়েন্দাপ্রধান হাসান রাশাদ, কাতারের কূটনীতিক আলি আল-থাওয়াদি এবং তুরস্কের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাও অংশ নেন।
ট্রাম্পের গাজা পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য গঠিত শান্তি পর্ষদ বা পিস বোর্ডের দূত নিকোলাই ম্লাদেনভ এবং পর্ষদের সদস্য ও সাবেক ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ারও কুশনারের সঙ্গে বৈঠকে ছিলেন।
ইসরায়েলের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের মতপার্থক্য
গাজা নিয়ে ট্রাম্পের প্রস্তাবিত পরিকল্পনা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে মতপার্থক্য ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে। এই পরিস্থিতিতে কুশনারের ইসরায়েল ও মিসর সফরকে গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক উদ্যোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
গত সপ্তাহে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ট্রাম্পের পরিকল্পনাকে ইসরায়েলের জন্য ‘অগ্রহণযোগ্য’ বলে মন্তব্য করেন। এর পরপরই পরিকল্পনাটি বাস্তবায়নে ইসরায়েলকে রাজি করানোর পাশাপাশি হামাস ও মধ্যস্থতাকারী দেশগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ জোরদারের চেষ্টা শুরু হয়।
ইসরায়েলের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, সোমবার কুশনার ও পিস বোর্ডের দূত নিকোলাই ম্লাদেনভের নেতানিয়াহুর সঙ্গে বৈঠক করার কথা রয়েছে। গাজায় হামাস যোদ্ধাদের লক্ষ্য করে হত্যাকাণ্ড বন্ধে ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে চাপ দেওয়ার সম্ভাবনা নিয়েও ইসরায়েলের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে বলে ওই কর্মকর্তা জানান।
ট্রাম্পের পরিকল্পনায় কী আছে
ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রস্তাবিত গাজা পরিকল্পনায় অবিলম্বে সামরিক অভিযান বন্ধের কথা বলা হয়েছে। এর পাশাপাশি গাজা থেকে ইসরায়েলি সেনাদের প্রত্যাহার, হামাসের অস্ত্র ত্যাগ এবং ভবিষ্যতে একটি নতুন বেসামরিক ফিলিস্তিনি প্রশাসনের অধীনে গাজা পুনর্গঠনের প্রস্তাব রয়েছে।
ট্রাম্প এর আগে দাবি করেছিলেন, যুদ্ধ বন্ধের লক্ষ্যে তাঁর পরিকল্পনা একটি বড় অগ্রগতি এবং ইসরায়েল ও হামাস উভয় পক্ষই এতে সম্মত হয়েছে। তবে পরিকল্পনাটির বিভিন্ন শর্ত, বিশেষ করে নিরাপত্তা, প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ এবং হামাসের ভবিষ্যৎ ভূমিকা নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে মতবিরোধ রয়ে গেছে।
হামাস জানিয়েছে, যুদ্ধ পুনরায় শুরু হওয়া ঠেকানোর লক্ষ্যেই তারা পরিকল্পনাটি গ্রহণের বিষয়ে সম্মতি জানিয়েছে। তবে সংগঠনটির দাবি, যুদ্ধবিরতি কার্যকর ও টেকসই করতে হলে প্রথমে ইসরায়েলকে নিজেদের প্রতিশ্রুতি পূরণ করতে হবে। এর মধ্যে গাজা থেকে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার এবং সামরিক হামলা বন্ধ করার বিষয়টি রয়েছে।
ইসরায়েলকে প্রতিশ্রুতি পূরণের আহ্বান হামাসের
রোববার এক বিবৃতিতে হামাস জানায়, তারা ট্রাম্পের পরিকল্পনা গ্রহণের বিষয়ে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করেছে। গাজায় যুদ্ধবিরতির মধ্যস্থতাকারী ও এর নিশ্চয়তাদাতা দেশগুলোর প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠকে সংগঠনটি এ অবস্থান তুলে ধরে।
হামাসের দাবি, যুদ্ধবিরতি চুক্তির প্রথম ধাপের শর্তগুলো তারা পুরোপুরি মেনে চলেছে। তবে ইসরায়েল সেই ধাপ বাস্তবায়নে ব্যর্থ হয়েছে। বরং স্থল অভিযান বাড়িয়ে এবং সামরিক কর্মকাণ্ড চালিয়ে গাজার মানবিক পরিস্থিতি আরও সংকটপূর্ণ করেছে বলে অভিযোগ করেছে সংগঠনটি।
হামাস মধ্যস্থতাকারী দেশ ও পিস বোর্ডের প্রতি নিজেদের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালনের আহ্বান জানিয়েছে। একই সঙ্গে ইসরায়েলকে প্রথম ধাপের প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়নে বাধ্য করা, যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন বন্ধ করা এবং সামরিক অভিযান ও হত্যাকাণ্ড বন্ধের দাবি জানিয়েছে তারা।
এ ছাড়া ট্রাম্পের পরিকল্পনার দ্বিতীয় ধাপে সম্মতি দেওয়ার পাশাপাশি সেটি বাস্তবায়নের জন্য একটি নির্দিষ্ট সময়সূচি তৈরির আহ্বানও জানিয়েছে হামাস।
মিসরের সঙ্গে কুশনারের আলোচনা
হামাসের সঙ্গে বৈঠকের পর মিসরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসির সঙ্গে বৈঠক করেন কুশনার। মিসরের প্রেসিডেন্ট কার্যালয় জানিয়েছে, বৈঠকে গাজা পরিস্থিতির পাশাপাশি দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক নিয়েও আলোচনা হয়েছে।
আল-সিসি যুক্তরাষ্ট্র ও মিসরের কৌশলগত অংশীদারত্বের গুরুত্ব তুলে ধরেন এবং অভিন্ন স্বার্থের বিভিন্ন বিষয়ে দুই দেশের চলমান সহযোগিতার প্রশংসা করেন। কুশনারও মিসরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সমন্বয়ের গুরুত্ব তুলে ধরে আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠায় সিসির ভূমিকার প্রশংসা করেন।
এদিকে রয়টার্স জানিয়েছে, হামাস নেতা খলিল আল-হায়া মিসরের গোয়েন্দাপ্রধান হাসান রাশাদের সঙ্গেও আলাদাভাবে বৈঠক করেছেন। গাজা যুদ্ধের মধ্যস্থতায় মিসরের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার কারণে এ বৈঠককেও তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
আরব ও মুসলিম দেশগুলোর নিন্দা
ট্রাম্পের গাজা পরিকল্পনা নিয়ে ইসরায়েলের আপত্তির সমালোচনা করেছে মিসর, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, জর্ডান, ইন্দোনেশিয়া, পাকিস্তান, তুরস্ক ও সৌদি আরব। এসব দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা যৌথভাবে ইসরায়েলের অবস্থানকে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন শান্তি উদ্যোগ এবং ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টার ওপর সরাসরি আঘাত হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
তাঁরা সতর্ক করে বলেছেন, ইসরায়েল যদি পরিকল্পনাটি বাস্তবায়নের পথ বন্ধ করে দেয়, তাহলে এর পুরো দায় দেশটিকেই নিতে হবে। একই সঙ্গে ওয়াশিংটনের প্রতি ইসরায়েলকে পরিকল্পনাটি মেনে চলতে বাধ্য করার আহ্বান জানিয়েছেন তাঁরা।
পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা আরও বলেছেন, ১৯৬৭ সালের সীমানার ভিত্তিতে ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনের দ্বিরাষ্ট্রীয় সমাধানই দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার সবচেয়ে কার্যকর পথ। শান্তি পরিকল্পনা বাস্তবায়নে যেকোনো বাধা দ্রুত মোকাবিলার জন্য পিস বোর্ডের প্রতিও আহ্বান জানিয়েছেন তাঁরা।
গাজায় হামলা অব্যাহত
কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়লেও গাজায় সহিংসতা পুরোপুরি থামেনি। চলতি মাসের শুরুতে ইসরায়েল গাজায় হামলার মাত্রা কিছুটা কমালেও সাম্প্রতিক দিনগুলোতে আবারও বিমান হামলা চালানোর খবর পাওয়া গেছে।
রোববার খান ইউনিসে একটি তাঁবুতে ইসরায়েলি হামলায় অন্তত পাঁচ ফিলিস্তিনি আহত হয়েছেন বলে চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন। মধ্য গাজার নুসেইরাত শরণার্থীশিবিরের একটি আবাসিক ভবনেও বিমান হামলা হয়েছে। এতে বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে।
এর আগে ২০২৫ সালের অক্টোবরে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও গাজায় ইসরায়েলি হামলা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি বলে ফিলিস্তিনি সূত্রগুলোর দাবি।
ফিলিস্তিনি সরকারি সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর থেকে গাজায় ইসরায়েলি হামলায় ১ হাজার ২৫০ জনের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। আর ২০২৩ সালের অক্টোবরে ইসরায়েল গাজায় যুদ্ধ শুরু করার পর থেকে নিহত ফিলিস্তিনির সংখ্যা ৭৩ হাজার ৩০০ ছাড়িয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে কুশনারের হামাসের সঙ্গে সরাসরি বৈঠক এবং একই সময়ে ইসরায়েল ও মিসরের সঙ্গে তাঁর কূটনৈতিক যোগাযোগ গাজা যুদ্ধ বন্ধের প্রচেষ্টায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে। তবে যুদ্ধবিরতি স্থায়ী করা, গাজার ভবিষ্যৎ প্রশাসন নির্ধারণ, হামাসের অস্ত্র ত্যাগ এবং ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহারের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতে সমঝোতা কতটা সম্ভব হবে, এখন সেটিই মূল প্রশ্ন।
মূল উৎস: প্রথম আলো — হামাস নেতাদের সঙ্গে কুশনারের বৈঠক
আন্তর্জাতিক সূত্র: আল-জাজিরা — গাজা শান্তি পরিকল্পনা ও হামাসের নিরস্ত্রীকরণ



