নতুন পে স্কেল ২০২৬ তালিকা: পদোন্নতি ছাড়াই উচ্চতর গ্রেড, নতুন পে স্কেলে বদলাচ্ছে যেসব সুবিধা

জাতীয় বেতনস্কেল ২০২৬-এর গেজেটে সরকারি কর্মচারীদের উচ্চতর গ্রেড, পেনশন, বাড়িভাড়া, চিকিৎসা ও বিভিন্ন ভাতার নতুন বিধান
নতুন পে স্কেল ২০২৬ তালিকা:পদোন্নতি ছাড়াই উচ্চতর গ্রেড, নতুন পে স্কেলে বদলাচ্ছে যেসব সুবিধা
বাংলাদেশ বেতন স্কেল অর্থ ব্যানার

ঢাকা: সরকারি কর্মচারীদের জন্য নতুন জাতীয় বেতনস্কেল ২০২৬-এ একই পদে আট বছর চাকরি পূর্ণ হলে পদোন্নতি ছাড়াই পরবর্তী উচ্চতর গ্রেড দেওয়ার বিধান রাখা হয়েছে। প্রথম উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার পর একই পদে আরও ছয় বছর চাকরি করলে দ্বিতীয় উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার সুযোগ থাকবে।

তবে একই পদে এই সুবিধা সর্বোচ্চ দুইবার নেওয়া যাবে। পদোন্নতির সুযোগ নেই—এমন কিছু ‘ব্লকড’ পদে নির্দিষ্ট শর্তে তৃতীয় উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।

গত ১৭ সেপ্টেম্বর জারি করা প্রজ্ঞাপনের ভিত্তিতে ১৯ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত জাতীয় বেতনস্কেল ২০২৬-এর গেজেটে সরকারি কর্মচারীদের বেতন নির্ধারণ, উচ্চতর গ্রেড, পেনশন, বাড়িভাড়া, চিকিৎসা, শিক্ষা সহায়তা ও অন্যান্য ভাতার বিষয়ে বিস্তারিত বিধান তুলে ধরা হয়েছে।

আট বছর পর প্রথম উচ্চতর গ্রেড

নতুন বিধান অনুযায়ী, কোনো স্থায়ী কর্মচারী একই পদে আট বছর চাকরি পূর্ণ করলে পদোন্নতি না হলেও পরবর্তী উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার যোগ্য হবেন। তবে তাঁর চাকরি সন্তোষজনক হতে হবে।

প্রথম উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার পর একই পদে আরও ছয় বছর চাকরি পূর্ণ হলে সপ্তম বছরে দ্বিতীয় উচ্চতর গ্রেড দেওয়ার সুযোগ থাকবে। এই সুবিধা পদোন্নতি হিসেবে গণ্য হবে না।

উচ্চতর গ্রেডের এই ব্যবস্থা বেতনস্কেলের চতুর্থ গ্রেড পর্যন্ত প্রযোজ্য হবে। চতুর্থ গ্রেড বা তার ওপরে থাকা কর্মচারীরা এই সুবিধার মাধ্যমে তৃতীয় বা তার ওপরে কোনো গ্রেডে যেতে পারবেন না।

গেজেটে বলা হয়েছে, ১ জুলাই ২০২৬-এর আগে যেসব স্থায়ী কর্মচারীর একই পদে আট বছর চাকরি পূর্ণ হয়েছে, কিন্তু ১০ বছর পূর্ণ হয়নি, তাঁরাও ওই তারিখ থেকে উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার যোগ্য হবেন।

একই পদে সর্বোচ্চ দুইবার

একই পদে উচ্চতর গ্রেডের আর্থিক সুবিধা একজন স্থায়ী কর্মচারী সর্বোচ্চ দুইবার পাবেন। আগের বেতনস্কেলের আওতায় একই পদে দুই বা তার বেশি সিলেকশন গ্রেড, টাইম স্কেল বা উচ্চতর গ্রেড পেয়ে থাকলে নতুন বেতনস্কেলে একই পদে আর উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার সুযোগ থাকবে না।

তবে ৩০ জুন ২০২৬ পর্যন্ত একই পদে মাত্র একটি উচ্চতর স্কেল বা গ্রেড পাওয়া থাকলে পরবর্তী ছয় বছর পূর্ণ হওয়ার পর দ্বিতীয় উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার সুযোগ থাকবে।

পদোন্নতির কোনো সুযোগ নেই এমন ‘ব্লকড’ পদে থাকা কর্মচারীদের জন্য তৃতীয় উচ্চতর গ্রেডের বিধানও রাখা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে প্রথম ও দ্বিতীয় উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার পর একই পদে আরও আট বছর করে চাকরি পূর্ণ করতে হবে। পুরো চাকরিজীবনে একই পদে এই সুবিধা সর্বোচ্চ তিনবার পাওয়া যাবে।

১ জুলাই থেকে নতুন বেতন নির্ধারণ

নতুন পে স্কেল ২০২৬ তালিকা-এ কর্মচারীদের বেতন কীভাবে নির্ধারণ করা হবে, তার একটি উদাহরণও দেওয়া হয়েছে।

গেজেট অনুযায়ী, ৩০ জুন ২০২৬ তারিখে কোনো কর্মচারীর পুরোনো স্কেলে মূল বেতন ১৩ হাজার ৭৯০ টাকা হলে নতুন স্কেলের সংশ্লিষ্ট ধাপে তাঁর বেতন ২৬ হাজার ৩০০ টাকা নির্ধারণ হতে পারে।

নতুন বেতন নির্ধারণের ক্ষেত্রে পুরোনো স্কেলের বর্তমান বেতন থেকে ওই স্কেলের প্রারম্ভিক বেতন বাদ দিয়ে যে পার্থক্য পাওয়া যাবে, তা নতুন স্কেলের প্রারম্ভিক বেতনের সঙ্গে সমন্বয় করা হবে। সমপরিমাণ কোনো ধাপ না থাকলে পরবর্তী উচ্চতর ধাপে বেতন নির্ধারণ করা হবে।

১ জুলাই ২০২৬ তারিখে পদোন্নতি পাওয়া কর্মচারীদের ক্ষেত্রে প্রথমে নিম্নপদের বেতন নির্ধারণ করে পরে পদোন্নতিপ্রাপ্ত পদের বিধি অনুযায়ী বেতন নির্ধারণ করা হবে। প্রেষণে থাকা কর্মচারীদের ক্ষেত্রে মূল প্রতিষ্ঠানে কর্মরত থাকলে যে বেতন পেতেন, সেই ভিত্তিতে নতুন বেতন নির্ধারণের বিধান রয়েছে।

পেনশনে সর্বোচ্চ ৭০,২০০ টাকা

নতুন বেতনস্কেলে অবসরভোগী ও আজীবন পারিবারিক পেনশনভোগীদের নিট পেনশন বাড়ানোর হারও নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে পেনশন ও গ্রাচুইটির বিদ্যমান হার অপরিবর্তিত থাকবে।

৩০ জুন ২০২৬-এর নিট পেনশনের ভিত্তিতে ১ জুলাই থেকে নতুন পেনশন নির্ধারণ করা হবে। বিভিন্ন স্তরে বৃদ্ধির হার হবে:

  • ৯ হাজার টাকা পর্যন্ত নিট পেনশনে ১০০ শতাংশ
  • ৯ হাজার ১ থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত ৭৫ শতাংশ
  • ২০ হাজার ১ থেকে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত ৬৫ শতাংশ
  • ৩০ হাজার ১ থেকে ৪০ হাজার টাকা পর্যন্ত ৬০ শতাংশ
  • ৪০ হাজার ১ টাকা বা তার বেশি নিট পেনশনে ৫৫ শতাংশ

নতুন ব্যবস্থায় সর্বনিম্ন নিট পেনশন নির্ধারণ করা হয়েছে ১০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ ৭০ হাজার ২০০ টাকা।

তবে কোনো অবসরভোগী এরই মধ্যে ৭০ হাজার ২০০ টাকার বেশি নিট পেনশন পেয়ে থাকলে ২০২৭ সালের ১ জুলাইয়ের পরবর্তী বার্ষিক বেতনবৃদ্ধির আগ পর্যন্ত আগের পরিমাণেই পেনশন পাবেন।

অবসর-উত্তর ছুটির ক্ষেত্রে ১২ মাস পূর্ণ গড় বেতনে ছুটি এবং ১৮ মাসের ছুটি নগদায়নের সুবিধা বহাল থাকবে।

বাড়িভাড়া বাড়বে ২০২৮ সালে

নতুন পে স্কেল ২০২৬ তালিকা বাড়িভাড়া ভাতার পরিবর্তিত হার ২০২৮ সালের ১ জানুয়ারি থেকে কার্যকর হবে। এর আগে ৩১ ডিসেম্বর ২০২৭ পর্যন্ত ৩০ জুন ২০২৬ তারিখে প্রচলিত হারেই বাড়িভাড়া ভাতা দেওয়া হবে।

ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় ২০২৮ সাল থেকে গ্রেডভেদে বাড়িভাড়া হবে মূল বেতনের:

গ্রেডবাড়িভাড়া
গ্রেড-২০ থেকে গ্রেড-১৬৬০%
গ্রেড-১৫ থেকে গ্রেড-১০৫০%
গ্রেড-৯ থেকে গ্রেড-৫৪৫%
গ্রেড-৪ থেকে গ্রেড-১ ও তদূর্ধ্ব৪০%

অন্যান্য নির্ধারিত সিটি করপোরেশন এবং সাভার-কক্সবাজার পৌর এলাকায় এই হার হবে যথাক্রমে ৫০%, ৪০%, ৩৫% ও ৩০%

দেশের অন্যান্য এলাকায় হার নির্ধারণ করা হয়েছে যথাক্রমে ৪৫%, ৩৫%, ৩০% ও ২৫%

চিকিৎসা ভাতা সর্বোচ্চ ৬ হাজার টাকা

কর্মরত সরকারি কর্মচারীদের চিকিৎসা ভাতা বয়স অনুযায়ী নির্ধারণ করা হয়েছে। ৫০ বছর বয়স পর্যন্ত মাসে ৩ হাজার টাকা এবং ৫০ বছর এক দিন বয়স থেকে পিআরএল শেষ হওয়া পর্যন্ত ৪ হাজার টাকা চিকিৎসা ভাতা দেওয়া হবে।

অবসরভোগী ও আজীবন পারিবারিক পেনশনভোগীদের জন্য বয়সভেদে চিকিৎসা ভাতা হবে:

  • ৫০ বছর পর্যন্ত: ৩,০০০ টাকা
  • ৫০ বছর এক দিন থেকে ৬০ বছর: ৪,০০০ টাকা
  • ৬০ বছর এক দিন থেকে ৭০ বছর: ৫,০০০ টাকা
  • ৭০ বছরের বেশি: ৬,০০০ টাকা

বাংলা নববর্ষ ভাতা ১৫ শতাংশ

সরকারি কর্মচারীরা আহরিত মূল বেতনের ১৫ শতাংশ হারে বাংলা নববর্ষ ভাতা পাবেন। মাসিক নিট পেনশন গ্রহণকারী অবসরভোগী ও আজীবন পারিবারিক পেনশনভোগীরাও এই সুবিধার আওতায় থাকবেন।

এ ছাড়া উৎসব ভাতা এবং শ্রান্তি-বিনোদন ভাতার বিদ্যমান ব্যবস্থা বহাল রাখা হয়েছে। অবসরভোগী ও আজীবন পারিবারিক পেনশনভোগীদের জন্য নিট পেনশনের সমপরিমাণ হারে বছরে দুটি উৎসব ভাতাও বহাল থাকবে।

শিক্ষা সহায়তা ও টিফিন ভাতা

সন্তানপ্রতি মাসে ৫০০ টাকা হারে শিক্ষা সহায়ক ভাতা দেওয়া হবে। সর্বোচ্চ দুই সন্তানের জন্য মাসে ১ হাজার টাকা পাওয়া যাবে। বয়সের সনদ দাখিল সাপেক্ষে সন্তানের বয়স ২৩ বছর পর্যন্ত এই সুবিধা প্রাপ্য হবে।

১১তম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীদের জন্য মাসে ৫০০ টাকা টিফিন ভাতার বিধান রাখা হয়েছে। তবে কোনো প্রতিষ্ঠান থেকে লাঞ্চ ভাতা বা বিনা মূল্যে দুপুরের খাবার দেওয়া হলে টিফিন ভাতা পাওয়া যাবে না।

চলতি বা অতিরিক্ত দায়িত্ব পালনের জন্য মাসে ১ হাজার ৫০০ টাকা কার্যভার ভাতা দেওয়ার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।

নতুন নিয়োগে অগ্রিম বেতনবৃদ্ধি

১ জুলাই ২০২৬ বা তার পর নিয়োগ পাওয়া কর্মচারীরা সংশ্লিষ্ট পদের নতুন বেতনস্কেলের প্রারম্ভিক ধাপে বেতন পাবেন।

তবে নবম গ্রেড বা তার ওপরে প্রথম নিয়োগের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট শিক্ষাগত যোগ্যতার ভিত্তিতে এক বা দুটি অগ্রিম বেতনবৃদ্ধির সুযোগ থাকবে।

কোনো পদের ন্যূনতম যোগ্যতা হিসেবে এমবিবিএস, ব্যাচেলর অব আর্কিটেকচার বা ইঞ্জিনিয়ারিং ডিগ্রি নির্ধারিত থাকলে একটি অগ্রিম বেতনবৃদ্ধি দেওয়া হবে। নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে উচ্চতর ডিগ্রি বা অন্যান্য নির্ধারিত উচ্চতর শিক্ষাগত যোগ্যতার জন্য দুটি অগ্রিম বেতনবৃদ্ধির বিধান রাখা হয়েছে।

বিসিএস ক্যাডারে নবম গ্রেডে সরাসরি নিয়োগ পাওয়া কর্মচারীরা একটি অতিরিক্ত অগ্রিম বেতনবৃদ্ধি পাবেন। তবে বিসিএস পরীক্ষায় অংশ নিয়ে ক্যাডার পদে সুপারিশ না পেলেও বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনের সুপারিশে নবম গ্রেডের নন-ক্যাডার পদে নিয়োগ পাওয়া ব্যক্তিদের বেতন নবম গ্রেডের প্রারম্ভিক ধাপেই নির্ধারণ করা হবে।

পূর্ণ বেতন পেতে নির্দিষ্ট চাকরির মেয়াদ

উচ্চতর পদে পদোন্নতির পর সংশ্লিষ্ট পদের পূর্ণ বেতন পেতে নবম বা তার ওপরে গ্রেডে নির্দিষ্ট সময়ের প্রকৃত চাকরির মেয়াদ পূরণ করতে হবে।

এ ক্ষেত্রে গ্রেড-১-এর জন্য ২০ বছর, গ্রেড-২-এর জন্য ১৭ বছর, গ্রেড-৩-এর জন্য ১৪ বছর, গ্রেড-৪-এর জন্য ১২ বছর, গ্রেড-৫-এর জন্য ১০ বছর, গ্রেড-৬-এর জন্য পাঁচ বছর এবং গ্রেড-৭-এর জন্য চার বছর চাকরির মেয়াদ প্রয়োজন হবে।

বার্ষিক বেতনবৃদ্ধি ১ জুলাই

নতুন পে স্কেল ২০২৬ তালিকা সব সরকারি কর্মচারীর বার্ষিক বেতনবৃদ্ধির নির্ধারিত তারিখ হবে অর্থবছরের প্রথম দিন, অর্থাৎ ১ জুলাই।

নতুন স্কেলে বেতন নির্ধারণের পর ১ জুলাই ২০২৬ তারিখে একটি বার্ষিক বেতনবৃদ্ধি দেওয়ার বিধান রাখা হয়েছে। নতুন নিয়োগ পাওয়া কর্মচারীর ক্ষেত্রে যোগ্য চাকরির মেয়াদ কমপক্ষে ছয় মাস হলে তিনি বার্ষিক বেতনবৃদ্ধির সুবিধা পাবেন।

তবে ভাতার নতুন পে স্কেল ২০২৬ তালিকা হার ২০২৮ সালের ১ জানুয়ারি থেকে কার্যকর হবে। ১ জুলাই ২০২৬ থেকে ৩১ ডিসেম্বর ২০২৭ পর্যন্ত নতুন নিয়োগ পাওয়া কর্মচারীরা ৩০ জুন ২০২৬ তারিখে সংশ্লিষ্ট পদে নিয়োগ পেলে যে হারে ভাতা পেতেন, সেই হারেই ভাতা পাবেন।


Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top