অপ্রতিম হত্যা: ১২ ঘণ্টায় চার গ্রেপ্তার, তবু অপ্রতিম হত্যার উত্তর খুঁজছে কুমিল্লা

নিজস্ব প্রতিবেদক-কুমিল্লা :- আপডেট: ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৪: ৩২
শুক্রবার দুপুরে মায়ের আইফোনটি নিয়ে বাসা থেকে বের হয়েছিল ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম। বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তুলবে—এই ছিল তার পরিকল্পনা। কিন্তু ১৩ বছরের সেই স্কুলছাত্র আর বাড়ি ফেরেনি। প্রায় ২২ ঘণ্টা পর কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশে সানন্দা গ্রামের লালমাই পাহাড়ের জঙ্গল থেকে উদ্ধার করা হয় তার মরদেহ। এক দিনেরও কম সময়ের মধ্যে একটি সাধারণ বিকেল বদলে যায় পরিবারের জন্য এক অসহনীয় শোকে।
অপ্রতিমের হত্যাকাণ্ডে জড়িত সন্দেহে চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। রোববার সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, মরদেহ উদ্ধারের পর ১২ ঘণ্টার মধ্যে সন্দেহভাজন সবাইকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। প্রথমে তিনজন এবং পরে আরও একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। মন্ত্রীর ভাষ্য অনুযায়ী, গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা অপরাধের কথা স্বীকার করেছে। তবে এসব স্বীকারোক্তি ও অন্যান্য আলামত আদালতে আইনগত প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই যাচাই হবে।
অপ্রতিম কুমিল্লার কোটবাড়ি এলাকার বর্ডার গার্ড পাবলিক স্কুলের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল। সে মা-বাবার সঙ্গে কুমিল্লা সদর দক্ষিণ থানার ২৪ নম্বর ওয়ার্ডের কোটবাড়ি এলাকায় থাকত। তার মা নাহিদা বেগম কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক। বাবা কে এম ফিরোজ শাহরিয়ার মোবাইল অ্যাকসেসরিজের ব্যবসা করেন। পরিবারের একমাত্র সন্তানকে হারানোর এই ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে গভীর শোক নেমে এসেছে।
পুলিশের বর্ণনা অনুযায়ী, অপ্রতিম নিখোঁজ হওয়ার পর পরিবার ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তার সন্ধানে তৎপর হয়। নিখোঁজের প্রায় ২২ ঘণ্টা পর বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছের জঙ্গল থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তদন্তকারীরা আশপাশের সিসিটিভি ফুটেজ, মোবাইল ফোনের তথ্য এবং অন্যান্য আলামত পরীক্ষা করছেন। স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অপ্রতিমের সঙ্গে কয়েকজন সন্দেহভাজনের পরিচয় ও বন্ধুত্ব ছিল।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পুলিশের ভূমিকার প্রশংসা করে বলেন, হত্যাকাণ্ডের পারিপার্শ্বিক তথ্য-উপাত্ত দ্রুত উদ্ধার করা হয়েছে। অপ্রতিমের হাতে থাকা মুঠোফোনটিও উদ্ধার করা হয়েছে বলে জানান তিনি। ফরেনসিক বিশ্লেষণ চলছে এবং ময়নাতদন্ত শেষে মরদেহ দাফন করা হয়েছে। একটি শিশুর নিখোঁজ হওয়ার পর প্রথম কয়েক ঘণ্টা তদন্তের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মোবাইল ফোন, সিসিটিভি ফুটেজ, যাতায়াতের পথ এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য—সবকিছুই দ্রুত সংগ্রহ না করলে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হারিয়ে যেতে পারে।
তবে দ্রুত গ্রেপ্তার তদন্তের শেষ নয়, শুরু। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ কী, হত্যাকাণ্ডে কার ভূমিকা কতটা, তারা কীভাবে ঘটনাস্থলে গিয়েছিল এবং অপ্রতিমের সঙ্গে তাদের সম্পর্কের প্রকৃতি কী ছিল—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো স্পষ্টভাবে প্রকাশ করা হয়নি। মামলার তদন্তকে আদালতে টেকসই করতে হলে পুলিশকে প্রত্যেক অভিযুক্তের নির্দিষ্ট ভূমিকা, হত্যার কারণ এবং ঘটনাক্রম প্রমাণ করতে হবে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, অপ্রতিম হত্যায় জড়িত ব্যক্তিরা অনেকটা কিশোর অপরাধী চক্রের মতো। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, তাদের সঙ্গে অপ্রতিমের ওঠাবসা ও বন্ধুত্ব ছিল এবং তাদের বয়স নিহত শিশুটির চেয়ে পাঁচ থেকে ১০ বছর বেশি। এই তথ্য মামলাটিকে আরও জটিল করে তুলেছে। এটি কোনো অপরিচিত ব্যক্তির আকস্মিক হামলা ছিল, নাকি পরিচিতদের একটি সম্পর্ক সহিংসতায় গড়িয়েছিল—তদন্তে তার উত্তর খুঁজে বের করা জরুরি।
‘কিশোর অপরাধী চক্র’ কথাটি দিয়ে পুরো ঘটনার ব্যাখ্যা করা যায় না। কিশোরদের মধ্যে বন্ধুত্ব, দলগত চাপ, অপরাধীসুলভ আচরণের অনুকরণ, মাদক, জুয়া কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিরোধ—বিভিন্ন কারণ সহিংসতার দিকে ঠেলে দিতে পারে। কিন্তু কোনো কারণই একটি শিশুকে হত্যার দায় কমায় না। একই সঙ্গে, অভিযুক্তদের বয়স ও ব্যক্তিগত ভূমিকার পার্থক্যও আইনের চোখে গুরুত্বপূর্ণ। কে পরিকল্পনা করেছে, কে ঘটনাস্থলে ছিল, কে সহায়তা করেছে এবং কে পরে আলামত গোপন করেছে—এসব আলাদা করে নির্ধারণ করতে হবে।
মন্ত্রী বলেন, সমাজের পচন ও নৈতিক অবক্ষয় বহু বছর ধরে তৈরি হয়েছে এবং এর বিভিন্ন লক্ষণ এখন দেখা যাচ্ছে। তিনি মাদক ও জুয়ার সঙ্গে অপরাধের সম্পর্কের কথাও উল্লেখ করেন। তাঁর মতে, সমস্যা মোকাবিলায় স্কুল পর্যায়ে খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড বাড়াতে হবে। শিশু-কিশোরদের জন্য বিনোদন, সৃজনশীলতা ও সুস্থ সামাজিক সম্পর্কের জায়গা তৈরি করা প্রয়োজন, যাতে তারা অপরাধী চক্রের প্রভাব থেকে দূরে থাকতে পারে।
কিন্তু খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড একাই সমস্যার সমাধান করতে পারবে না। পরিবার, স্কুল, স্থানীয় প্রশাসন, পুলিশ, শিশু সুরক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং বিচারব্যবস্থাকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। কিশোরদের আচরণে হঠাৎ পরিবর্তন, মাদক বা জুয়ার সংশ্লিষ্টতা, সহিংস গোষ্ঠীর সঙ্গে যোগাযোগ কিংবা অস্বাভাবিক গোপনীয়তার মতো লক্ষণ দেখা গেলে বড়দের তা গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে। অনেক ক্ষেত্রে শিশুরা বিপদের মধ্যে থাকলেও তা জানাতে পারে না, অথবা তাদের কথা গুরুত্ব পায় না।
অপ্রতিম হত্যার ঘটনায় কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে শোকের আবহ তৈরি হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ সাধারণ শোক ঘোষণা করেছে বলে স্থানীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে। শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ করে দ্রুত বিচার দাবি করেছে। তাদের ক্ষোভের কেন্দ্রে শুধু একটি পরিবারের শোক নেই; আছে এই প্রশ্নও—বিশ্ববিদ্যালয়ের আশপাশের পরিচিত এলাকায় কীভাবে একটি শিশু নিরাপত্তাহীন হয়ে পড়ল এবং তার সঙ্গে যোগাযোগ থাকা ব্যক্তিদের আচরণ আগে কারও নজরে এল না।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, অপ্রতিম হত্যা মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দ্রুত দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হবে। তিনি পল্লবীতে আট বছরের এক শিশুকে ধর্ষণের পর হত্যার মামলার কথাও উল্লেখ করেন। দীর্ঘসূত্রতা নিয়ে জনমনে যে হতাশা তৈরি হয়, তা বিবেচনায় দ্রুত তদন্ত প্রতিবেদন গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু দ্রুততার অর্থ যেন অসম্পূর্ণ তদন্ত না হয়। একটি নির্ভরযোগ্য মামলা গড়তে ফরেনসিক প্রতিবেদন, ময়নাতদন্তের ফল, প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্য, ডিজিটাল তথ্য এবং আলামতের বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ—সবই প্রয়োজন।
গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা অপরাধ স্বীকার করেছে—স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এই বক্তব্য জনমনে নানা প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছে। কিন্তু কোনো স্বীকারোক্তিই স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রমাণের বিকল্প নয়। তদন্তকারীদের নিশ্চিত করতে হবে, স্বীকারোক্তি কী পরিস্থিতিতে নেওয়া হয়েছে এবং তার সঙ্গে অন্যান্য তথ্যের মিল আছে কি না। মোবাইল ফোনের তথ্য, কল রেকর্ড, অবস্থান-সংক্রান্ত ডেটা, সিসিটিভি ফুটেজ ও ফরেনসিক আলামত একে অন্যকে সমর্থন করছে কি না—মামলার ভবিষ্যৎ অনেকটাই তার ওপর নির্ভর করবে।
অভিযুক্তদের মধ্যে কেউ ১৮ বছরের কম বয়সী হলে তার ক্ষেত্রে শিশু আইন অনুযায়ী প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে। কোনো শিশুর বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ থাকলেও তার আইনগত অধিকার অস্বীকার করা যায় না। একইভাবে, অভিযুক্তের বয়স কম বলে নিহত শিশুর পরিবারের ন্যায়বিচারের অধিকারও কমে যায় না। বিচারব্যবস্থার দায়িত্ব হলো—ভুক্তভোগী ও অভিযুক্ত উভয়ের অধিকার রক্ষা করে সত্য উদ্ঘাটন করা।
এই মামলায় পুলিশের দ্রুত পদক্ষেপ প্রশংসার দাবি রাখে বলে জানিয়েছেন মন্ত্রী। মরদেহ উদ্ধার, সন্দেহভাজনদের শনাক্ত করা এবং ১২ ঘণ্টার মধ্যে চারজনকে গ্রেপ্তার—সবই তদন্তের প্রাথমিক পর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। কিন্তু একটি মামলার সাফল্য শুধু গ্রেপ্তারের সংখ্যায় মাপা যায় না। প্রকৃত সাফল্য হবে, তদন্তে সত্য বেরিয়ে আসা, নির্দোষ কেউ হয়রানির শিকার না হওয়া, প্রকৃত দায়ীদের বিরুদ্ধে আদালতে প্রমাণ উপস্থাপন করা এবং বিচার প্রক্রিয়া অযথা দীর্ঘ না হওয়া।
অপ্রতিমের পরিবারের জন্য এসব আইনি ও তদন্ত-সংক্রান্ত বিষয় কোনো বিমূর্ত আলোচনা নয়। তাদের কাছে অপ্রতিম ছিল একমাত্র সন্তান—একজন সপ্তম শ্রেণির ছাত্র, যে বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তুলতে মায়ের ফোন নিয়ে বাড়ি থেকে বের হয়েছিল। এই সাধারণ দৃশ্যটিই ঘটনাটিকে আরও বেদনাদায়ক করে তোলে। সে কোনো অজানা দূরবর্তী জায়গায় যায়নি; পরিচিত মানুষ ও পরিচিত পরিবেশের মধ্যেই তার জীবন থেমে গেছে।
এখন কুমিল্লার মানুষের সামনে কয়েকটি কঠিন প্রশ্ন। অপ্রতিমের সঙ্গে অভিযুক্তদের সম্পর্ক কতটা ঘনিষ্ঠ ছিল? কী কারণে তাকে ওই স্থানে নেওয়া হয়েছিল? হত্যাকাণ্ডের পেছনে মাদক, জুয়া, অর্থ, ব্যক্তিগত বিরোধ নাকি অন্য কোনো কারণ ছিল? কেউ কি আগে থেকে বিপদের আভাস পেয়েছিল? এসব প্রশ্নের উত্তর গুজব বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রচারে নয়, নিরপেক্ষ তদন্তে খুঁজে বের করতে হবে।
অপ্রতিম হত্যাকাণ্ড একটি পরিবারের শোকের ঘটনা হলেও এর অভিঘাত অনেক বিস্তৃত। এটি দেখিয়ে দিয়েছে, কিশোরদের সম্পর্ক, চলাফেরা ও অনলাইন-অফলাইন জগতের ওপর নজরদারি কতটা জটিল হয়ে উঠেছে। একই সঙ্গে এটি মনে করিয়ে দিয়েছে, শিশুদের নিরাপত্তা শুধু পরিবারের দায়িত্ব নয়। স্কুল, বিশ্ববিদ্যালয়, স্থানীয় সমাজ, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং রাষ্ট্র—সব পক্ষের দায়িত্ব আছে।
দ্রুত গ্রেপ্তার জনমনে কিছুটা স্বস্তি আনতে পারে, কিন্তু ন্যায়বিচারের নিশ্চয়তা দিতে পারে না। সেই নিশ্চয়তা আসবে প্রমাণভিত্তিক তদন্ত, স্বচ্ছ বিচার এবং দায়ীদের আইনের আওতায় আনার মাধ্যমে। অপ্রতিমের মৃত্যুর সত্য যত দ্রুত এবং নির্ভুলভাবে প্রকাশ পাবে, ততই তার পরিবার ও সমাজের জন্য তা গুরুত্বপূর্ণ হবে। আর যদি তদন্ত থেকে কিশোর অপরাধ, মাদক, জুয়া বা সামাজিক অবহেলার কোনো যোগসূত্র বেরিয়ে আসে, তবে সেই কারণগুলো মোকাবিলায় কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়াই হবে এই শোকের প্রতি রাষ্ট্রের সবচেয়ে অর্থবহ জবাব।



