ময়মনসিংহ মেডিকেলে আগুন: চার মৃত্যু, পদদলিত হয়ে মৃত্যুর প্রমাণ নেই

ময়মনসিংহ, ১৫ সেপ্টেম্বর: ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে অগ্নিকাণ্ডের পর চারজনের মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেলেও তাঁদের কেউ পদদলিত হয়ে মারা গেছেন—এমন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছে প্রশাসন। মৃতদের মধ্যে দুজন স্বাভাবিকভাবে মারা গেছেন বলে তাঁদের পরিবারের সদস্যরা নিশ্চিত করেছেন। অন্য দুজনের মৃত্যুর কারণ এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
সোমবার সন্ধ্যায় হাসপাতালের নতুন ভবনের অষ্টম তলায় আগুন লাগার পর রোগী ও স্বজনদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। এ সময় অনেকে হুড়োহুড়ি করে সিঁড়ি দিয়ে নামার চেষ্টা করলে কয়েকজন আহত হন। পরে পদদলিত হয়ে ছয়জনের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ে।
রাত সাড়ে ১২টার দিকে হাসপাতাল পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন ময়মনসিংহ বিভাগীয় কমিশনার এস এম হুমায়ুন কবির এবং ময়মনসিংহ-৪ (সদর) আসনের সংসদ সদস্য আবু ওয়াহাব আকন্দ ওয়াহিদ।
বিভাগীয় কমিশনার এস এম হুমায়ুন কবির বলেন, পদদলিত হয়ে ছয়জনের মৃত্যুর কোনো তথ্য-প্রমাণ প্রশাসন এখন পর্যন্ত পায়নি।
তিনি বলেন, “আমরা ফায়ার সার্ভিস, জরুরি বিভাগের চিকিৎসক, নার্স ও অন্য কর্মীদের সঙ্গে কথা বলেছি। তাঁদের রেজিস্টারও যাচাই করেছি। পদদলিত হয়ে মৃত্যুর কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।”
পাঁচজনের মৃত্যুর একটি তালিকা পাওয়া গেছে উল্লেখ করে কমিশনার বলেন, তালিকায় থাকা একজন এখনো হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। বাকি চারজনের মধ্যে দুজন স্বাভাবিকভাবে মারা গেছেন বলে তাঁদের পরিবারের সদস্যরা নিশ্চিত করেছেন। অন্য দুজনের মৃত্যুর কারণ চিকিৎসকেরা এখনো নিশ্চিত করতে পারেননি।
তিনি বলেন, তদন্তের পর তাঁদের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে বিস্তারিত জানা যাবে।
তবে আগুনের পর আতঙ্কে হুড়োহুড়ির সময় কয়েকজন আহত হওয়ার কথা জানিয়েছেন বিভাগীয় কমিশনার। তাঁদের কারও হাত-পা কেটে যাওয়া কিংবা মাথায় আঘাত লাগতে পারে বলেও তিনি জানান। ধোঁয়ায় কারও মৃত্যু হয়েছে কি না, সে বিষয়ে প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিশ্চিত কোনো তথ্য দেওয়া হয়নি।
দুটি সিঁড়ির একটি বন্ধ ছিল
হাসপাতালের দুটি সিঁড়ির মধ্যে একটি বন্ধ থাকায় রোগী ও স্বজনেরা একটি সিঁড়ি দিয়ে নামতে গিয়ে হুড়োহুড়িতে পড়েন—এমন অভিযোগের বিষয়ে বিভাগীয় কমিশনার বলেন, বিষয়টি তাঁরা জানতে পেরেছেন।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, নিরাপত্তার কারণে কিছু সিঁড়ি বন্ধ রাখা হয়েছিল। তবে হাসপাতাল ব্যবস্থাপনায় কোনো অনিয়ম ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা হবে বলে জানান তিনি।
এর আগে সংসদ সদস্য ও হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা কমিটির সহসভাপতি আবু ওয়াহাব আকন্দ বলেন, মৃত ব্যক্তিদের তালিকায় এমন একজনের নাম রয়েছে, যিনি এখনো জীবিত এবং হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
তিনি বলেন, “জাহানারা নামে যে রোগীর নাম মৃতের তালিকায় দেওয়া হয়েছে, তিনি জীবিত। তিনি এখনো চিকিৎসা নিচ্ছেন। তালিকার সঙ্গে বাস্তবতা মিলিয়ে দেখলেই বিষয়টি পরিষ্কার হবে।”
স্বজনদের দাবি, সিঁড়িতে পড়ে দুজনের মৃত্যু
তবে অগ্নিকাণ্ডের পর আতঙ্কে দৌড়াদৌড়ির সময় সিঁড়িতে পড়ে দুজনের মৃত্যু হয়েছে বলে দাবি করেছেন তাঁদের স্বজনেরা।
মৃত দুজন হলেন তারাকান্দার বালিখা গ্রামের শহিদুল ইসলামের স্ত্রী কুলসুম আক্তার (৩৫) এবং ফুলপুরের রাঙামাটিয়া ইউনিয়নের বিষ্ণুরামপুর গ্রামের শাহাজাহান মনির (৪৫)।
সোমবার দিবাগত রাত ১২টার দিকে কুলসুম আক্তারের ননদ নাজমা আক্তার বলেন, জন্ডিসে আক্রান্ত ১২ বছর বয়সী ছেলে স্বাধীনকে নিয়ে কুলসুম ১২ দিন ধরে হাসপাতালের ৩১ নম্বর শিশু ওয়ার্ডে ছিলেন। তাঁর সঙ্গে ছিলেন ১৮ বছর বয়সী মেয়ে মিমও।
নাজমার ভাষ্য অনুযায়ী, আগুন লাগার পর হাসপাতালের ভেতরে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়লে কুলসুম তাঁর ছেলে ও মেয়েকে নিয়ে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামার চেষ্টা করেন। মিম আগে বের হয়ে যান। পরে ফিরে এসে তিনি দেখতে পান, লোকজন তাঁর ভাই স্বাধীনকে টেনে বের করছেন; কিন্তু কুলসুমকে পাওয়া যাচ্ছে না।
পরে কুলসুমকে উদ্ধার করে অক্সিজেন দেওয়া হয়। তখনো তাঁর শ্বাস চলছিল বলে জানান নাজমা। তবে হাসপাতালে নেওয়ার পর তাঁর মৃত্যু হয়।
নাজমা বলেন, তাঁদের এ ঘটনায় অভিযোগ রয়েছে। হাসপাতাল থেকে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিয়ে তাঁরা কুলসুমের মরদেহ বাড়িতে নিয়ে গেছেন।
অন্যদিকে শাহাজাহান মনির প্রায় ১০ থেকে ১২ দিন ধরে হাসপাতালের নতুন ভবনের তৃতীয় তলায় যক্ষ্মার চিকিৎসা নিচ্ছিলেন।
তাঁর ছেলে পলাশ মোল্লা বলেন, আগুন লাগার সময় তাঁর বাবা, মা হারিসা আক্তার ও খালা জাহানারা আক্তার একসঙ্গে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামছিলেন। এ সময় পেছন থেকে লোকজনের ধাক্কায় তাঁরা পড়ে যান।
পরে হারিসা ও জাহানারাকে আহত অবস্থায় হাসপাতালে নেওয়া হয়। তাঁরা হাসপাতালের ১০ নম্বর ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন রয়েছেন বলে জানান পলাশ।
তিনি বলেন, ঘটনার সময় তিনি হাসপাতালে ছিলেন না। পরে এসে মায়ের সঙ্গে দেখা করেন। তাঁর বাবার মরদেহ স্বজনেরা বাড়িতে নিয়ে গেছেন এবং তিনি মুঠোফোনে মরদেহের ছবি দেখেছেন।
১০ মিনিটে ঘটনাস্থলে ফায়ার সার্ভিস
ময়মনসিংহ ফায়ার সার্ভিসের সহকারী পরিচালক পূর্ণ চন্দ্র মুৎসুদ্দী বলেন, সন্ধ্যা ৫টা ৫৫ মিনিটে তাঁরা হাসপাতালে আগুন লাগার খবর পান। প্রায় ১০ মিনিটের মধ্যে ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ শুরু করেন ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা।
তিনি জানান, ফায়ার সার্ভিসের ১০টি ইউনিট আগুন নেভানোর কাজে অংশ নেয়। সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে আগুন সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে আসে।
ফায়ার সার্ভিসের প্রাথমিক ধারণা, হাসপাতালের নতুন আটতলা ভবনের একটি লিফটের কন্ট্রোল রুমে থাকা কন্ট্রোলার মেশিনের সঙ্গে সংযুক্ত বোর্ডে বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিটের কারণে অতিরিক্ত উত্তাপ সৃষ্টি হয়। সেখান থেকেই আগুনের সূত্রপাত হতে পারে।
তবে আগুন লাগার প্রকৃত কারণ তদন্তের পর নিশ্চিত হওয়া যাবে বলে জানিয়েছেন ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা।



